ছবি: সংগৃহীত
দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১৪৮ ফ্লাইটটি অবতরণ করে। ওই ফ্লাইট থেকে প্রায় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ, অর্থাৎ ১৬০টি স্বর্ণের বার, চোরাচালান বিরোধী অভিযানে জব্দ করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা, শুল্ক গোয়েন্দা, এভসেক এবং কাস্টমসের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ দল এ অভিযান পরিচালনা করে। সংশ্লিষ্টরা জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এভসেকের সহায়তায় বিমানের কার্গো হোল্ডে তল্লাশি চালিয়ে বিশেষভাবে লুকানো অবস্থায় এসব স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। জব্দ করা স্বর্ণের বাজারমূল্য আনুমানিক ৪৫ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ শুধু একটি ঘটনা নয়, মূলত এভাবে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের অন্যতম প্রধান রুট হয়ে উঠেছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এর আগে গত ১১ জুন চোরাচালানের প্রায় ৬০০ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ ছয়জনকে আটক করে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এপিবিএন জানায়, আটক ব্যক্তিরা ‘চোরাচালান চক্রের সদস্য’, তাঁরা ওই চক্রের ‘রিসিভার’ হিসেবে কাজ করতেন। এর আগে গত ২৮ মার্চ চোরাচালানের প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়।
গত সাড়ে পাঁচ বছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০২ কেজি (৪৭.৫৫ মণ) চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত এসব স্বর্ণের মূল্য বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের গতকাল শুক্রবার নির্ধারিত ২২ ক্যারেট দামের ভিত্তিতে (প্রতি ভরি ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা) প্রায় ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। এসব পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দুবাইকেন্দ্রিক চোরাচালান চক্রগুলো বিভিন্ন অভিনব কৌশলে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও স্বর্ণ চোরাচালানের প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি), শুল্ক গোয়েন্দা, এপিবিএনসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে দেশজুড়ে প্রতি মাসেই ছোট-বড় অসংখ্য স্বর্ণ চোরাচালান জব্দ করা হচ্ছে।
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য মতে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের এ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে শতাধিক অভিযানে বিমানবন্দর থেকে এক হাজার ৯০২ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের পরও এই রুটে কারবারিরা ঝুঁকি নিয়ে চোরাচালান অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ ৪৫ কোটি টাকার সোনার চালান জব্দ সেই কথা মনে করিয়ে দেয়। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, আগের তুলনায় নজরদারি অনেক বেড়েছে। সে কারণে চোরাচালানের ঘটনা কমে আসছে।
স্বর্ণ জব্দ ও মামলার পরিসংখ্যান
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৬৯৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৫ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ ৪১৭ কেজি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের এ পর্যন্ত স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে ৫৪০টি মামলা করা হয়েছে। তবে অনেক ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় বেশির ভাগ মামলার আসামি অজ্ঞাতপরিচয়।
শাহজালাল কেন বিশেষ টার্গেট
স্বর্ণ পাচারের রুট হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে। বেশির ভাগ চালান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে আসে, পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকেও বিভিন্ন ফ্লাইটে স্বর্ণ আনা হয়। চোরাকারবারিরা কখনো যাত্রীর শরীরে, কখনো বিমানের সিট, টয়লেট, বর্জ্য ট্রলি কিংবা কার্গো অংশে স্বর্ণ লুকিয়ে পাচারের চেষ্টা করে। একের পর এক চালান ধরা পড়লেও চক্রটি কেন বারবার এই রুট ব্যবহার করছে তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমানভাবে অনেক চালান ধরা পড়লেও এর চেয়েও বড় পরিমাণ স্বর্ণ হয়তো নজর এড়িয়ে নিরাপদে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই চক্রটি বারবার এই বিমানবন্দরকেই তাদের প্রধান রুট হিসেবে বেছে নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাহক ধরা না পড়ায় আসামি অজ্ঞাতপরিচয়
সর্বশেষ চালানে কোনো বাহক ধরা না পড়ায় মামলার এজাহারে অজ্ঞাতপরিচয় আসামির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে গত ২৮ মার্চ প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটে বিশেষ কৌশলে লুকানো অবস্থায় এসব স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। ২৪ ক্যারেটের এসব স্বর্ণের বাজারমূল্য আনুমানিক প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। ওই ঘটনায়ও মামলা হলেও কোনো নির্দিষ্ট আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। এরপর মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে, গত ২ জুলাই একই ধরনের আরেকটি চালান জব্দ করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরপর দুটি ঘটনার মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে—একই এয়ারলাইনস এবং প্রায় একই পরিমাণ স্বর্ণ। তাদের মতে, এতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা থাকতে পারে এবং এর পেছনে আরও কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। তদন্ত করছে পুলিশ। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাচারে অভিনব যত কৌশল
বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণ জব্দ করার চিত্র বলছে, পাচারকারীরা টয়লেট থেকে ট্রলি, ব্যাটারি থেকে বেল্ট—অভিনব যত কৌশল সবই ব্যবহার করছে। চোরাকারবারি চক্রগুলো কখনো কেবিন ক্রু, বিমানবালা, ফ্লাইটের পাইলট, ইঞ্জিনিয়ার, ট্রলিম্যান কিংবা ক্লিনারদের ব্যবহার করছে। আবার কখনো যাত্রীবেশী বাহক দিয়ে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ইলেকট্রিক মোটর, ট্রলির হ্যান্ডল, হুইলচেয়ার, জুতা, বেল্টের কোমরবন্ধনী, শার্টের কলার, সাবানের কেস, সাউন্ড বক্সের অ্যাডাপ্টার, ওষুধের কৌটা, ল্যাপটপের ব্যাটারি এবং মলদ্বারে বা দেহের বিভিন্ন অংশে লুকিয়ে স্বর্ণ নিয়ে আসে। এমনকি স্বর্ণের বারের ওপর কালো অথবা সিলভার রঙের প্রলেপ দিয়ে কিংবা গলায় সাধারণ চেইনের সঙ্গে লকেট হিসেবে ঝুলিয়েও বার পাচারের চেষ্টা করা হয়।
যে কারণে আকর্ষণীয় দুবাই রুট
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে দুবাই থেকে পরিচালিত চক্রগুলো বাংলাদেশকে ট্রানজিট ও বাজার দুই হিসেবেই ব্যবহার করছে। সস্তায় স্বর্ণ সংগ্রহ, উচ্চ চাহিদা, কর ফাঁকি এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে এই রুট তাদের কাছে অত্যন্ত লাভজনক। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় প্রতিটি বড় চালানের সঙ্গেই দুবাই সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার শুল্কের তুলনায় ভারতে শুল্কের হার অনেক বেশি। এর ফলে চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশে সোনা পাচার করে। অন্যদিকে শুল্ক গোয়েন্দাদের তথ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশকেন্দ্রিক প্রায় ৭০টি সক্রিয় সিন্ডিকেট এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
বিদেশে বাংলাদেশি সিন্ডিকেট
বিগত সরকারের সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে যেসব বাংলাদেশি স্বর্ণ চোরাচালান পরিচালনা করছিল এমন অন্তত এক ডজনের বেশি ব্যক্তির নাম গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসেছে। এ ছাড়া আকাশপথে চোরাচালানে মূল হোতার সহযোগী হিসেবে সিভিল এভিয়েশন ও শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের নামও এসেছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চ্যালেঞ্জ
কাস্টমস, গোয়েন্দা সংস্থা, এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ও অন্যান্য সংস্থার অভিযান বাড়লেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে মূল হোতাদের শনাক্ত করা নিয়ে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ জব্দ করা হলেও ক্যারিয়ার বা প্রকৃত সংগঠকদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিমানবন্দরে স্ক্যানিং, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আন্ত সংস্থার সমন্বয় আরো শক্তিশালী করা গেলে স্বর্ণ চোরাচালান উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
নতুন চালান জব্দের পর নড়েচড়ে বসছে প্রশাসন
বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমনী ও বহির্গমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বমানের হলেও একসঙ্গে একাধিক ফ্লাইট অবতরণ করলে যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়। সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তথ্যদাতার মাধ্যমে পৃথকভাবে তল্লাশি চালানো হয়। এর পরও চোরাকারবারিদের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে গত বৃহস্পতিবারের স্বর্ণ জব্দের ঘটনার পর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ গণমাধ্যমকে বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে নজরদারি অনেক বেশি। বিমানবন্দরকে চোরাকারবারিমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে এবং এসব প্রচেষ্টার ফলেই স্বর্ণের চালান ধরা পড়ছে। এদিকে ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, স্বর্ণের চোরাচালান জব্দের পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করা হচ্ছে। তবে চোরাচালানের মূল উৎসস্থল হিসেবে দুবাইসহ অন্যান্য দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



