ছবি: সংগৃহীত
চলতি অর্থবছরে প্রথমবার আয়কর রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য বিশেষ করসুবিধা বহাল রেখেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন করদাতাদের কর ব্যবস্থায় যুক্ত হতে উৎসাহিত করতে তাদের জন্য ন্যূনতম কর মাত্র এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমবার যারা আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন, তারা করযোগ্য আয়ের আওতায় এলেও মাত্র এক হাজার টাকা ন্যূনতম কর পরিশোধ করেই রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। অন্যদিকে নিয়মিত করদাতাদের জন্য ন্যূনতম কর পাঁচ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, করজাল সম্প্রসারণ এবং নতুন করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসাই এই সুবিধার মূল উদ্দেশ্য। দীর্ঘদিন ধরেই নতুন করদাতাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার বিষয়টি কার্যকর রয়েছে। চলতি অর্থবছরেও সেই নীতি বহাল রেখে কর ব্যবস্থাকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার চেষ্টা করছে এনবিআর।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তবে এই বিপুল সংখ্যক টিআইএনধারীর মধ্যে বছরে গড়ে মাত্র ৪০ থেকে ৪২ লাখ ব্যক্তি নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। অর্থাৎ, টিআইএনধারীদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন কারণে রিটার্ন জমা দেন না। এই বাস্তবতায় নতুন করদাতাদের জন্য কম ন্যূনতম কর নির্ধারণকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে নতুন করদাতারা সহজেই কর ব্যবস্থায় যুক্ত হতে আগ্রহী হবেন এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত করদাতার সংখ্যাও বাড়বে।
এদিকে চলতি অর্থবছর থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে বার্ষিক সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত ছিল, এখন সেই সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। ফলে চার লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক আয় হলে কোনো আয়কর দিতে হবে না। এর বেশি আয় হলে নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী কর গণনা করা হবে।
নতুন করহার অনুযায়ী, করমুক্ত সীমার পরবর্তী প্রথম তিন লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে। এরপরের চার লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী পাঁচ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ, এরপরের ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে।
কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম করের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তির বার্ষিক করযোগ্য আয় যদি চার লাখ ২০ হাজার টাকা হয়, তাহলে করমুক্ত সীমা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ২০ হাজার টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দাঁড়ায় দুই হাজার টাকা। কিন্তু নিয়মিত করদাতাদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর পাঁচ হাজার টাকা হওয়ায় তাকে দুই হাজার টাকার পরিবর্তে পাঁচ হাজার টাকাই পরিশোধ করতে হবে।
অন্যদিকে একই পরিমাণ আয় নিয়ে যদি কোনো ব্যক্তি প্রথমবার আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, তাহলে তার ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর হিসেবে মাত্র এক হাজার টাকা পরিশোধ করলেই হবে। ফলে নতুন করদাতারা নিয়মিত করদাতাদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাচ্ছেন। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সুবিধা নতুন করদাতাদের কর ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এবারের অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, করদাতারা এখন আর নির্দিষ্ট একটি মৌসুমের জন্য অপেক্ষা না করে বছরের যেকোনো সময় আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। তবে এই সুবিধা কেবল অনলাইনের মাধ্যমে প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে।
শুধু সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগই নয়, এবার সময়ভিত্তিক করছাড় ও অতিরিক্ত কর প্রদানের ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিতে করদাতাদের উৎসাহিত করতেই এই নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতারা পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা—যেটি কম, সেই পরিমাণ করছাড় পাবেন। ফলে যাদের করের পরিমাণ বেশি, তারাও নির্ধারিত সীমার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছাড়ের সুবিধা নিতে পারবেন।
দ্বিতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে কোনো অতিরিক্ত করছাড় বা জরিমানার বিধান থাকবে না। এ সময়ে করদাতারা কেবল নির্ধারিত পরিমাণ কর পরিশোধ করলেই তাদের দায় সম্পন্ন হবে।
তবে তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা ন্যূনতম তিন হাজার টাকা—যেটি বেশি হবে, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
আর অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে অতিরিক্ত করের পরিমাণ আরও বাড়বে। এ সময় পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা—যেটি বেশি হবে, সেই পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত কর হিসেবে দিতে হবে।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এই ব্যবস্থা করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে বছরের শুরুতেই বেশি সংখ্যক রিটার্ন জমা পড়লে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং সরকারের রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াও গতিশীল হবে। পাশাপাশি সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থা চালুর ফলে করদাতাদের ভোগান্তি কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থার বাস্তবায়ন আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



