ছবি: সংগৃহীত
আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনাকেও খোলামেলা আলোচনায় আনলেন। নিউইয়র্কে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি একদিকে যেমন সার্ক ও আসিয়ানসহ আঞ্চলিক সংস্থার ভূমিকাকে জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন, অন্যদিকে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিলতা নিয়েও কথা বলেছেন।
এশিয়া সোসাইটি ও এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছাড়া এই অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। সহযোগিতার মাধ্যমে উপকৃত হবে সবাই।” তিনি মনে করিয়ে দেন, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল দর্শনই হলো পারস্পরিক বিনিয়োগ ও যোগাযোগ বাড়ানো। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনি আশ্বস্ত করেন, ঢাকা যেমন বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিও বিনিয়োগে আগ্রহী থাকবে।
ইউনূস স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও কার্যক্রমের বিষয়টি অন্যতম। তিনি বলেন, “ভারতীয়রা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কিছু বিষয় পছন্দ করেনি। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে টান পড়েছে।”
এর পাশাপাশি তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন। ইউনূসের অভিযোগ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তরুণদের মৃত্যুর জন্য দায়ী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। এই বিষয়টি সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি আরও বলেন, ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে ছড়ানো মিথ্যা খবরও পরিস্থিতি খারাপ করেছে।
ইউনূস ব্যঙ্গ করে বলেন, ইসলামি আন্দোলন নিয়ে অনেক ভুয়া খবর ছড়ানো হয়েছে, যেখানে তালেবানের প্রশিক্ষণের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ দেখানো হয়েছে। এমনকি তাঁকেও তালেবান বলে অপপ্রচার করা হয়েছে। তিনি হেসে বলেন, “আমার দাড়ি নেই, বাড়িতে রেখে এসেছি।”
ড. ইউনূস মনে করিয়ে দেন, সার্কের ধারণার জন্ম বাংলাদেশেই। তিনি বলেন, সার্ক আসলে একটি পরিবারের মতো, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একত্রিত করার মূল চিন্তা ছিল। তরুণদের পারস্পরিক যোগাযোগ, শিক্ষায় অংশগ্রহণ, ব্যবসা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান ছিল সার্কের উদ্দেশ্য। তবে কিছু রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সার্ক কার্যক্রম স্থবির হয়ে গেছে।
তবে তিনি আশাবাদী যে একদিন এই প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় হবে। “আমরা দুঃখিত, এটি স্থগিত হয়েছে। কিন্তু আমরা চাই সবাইকে আবার একত্রিত করতে। সেটাই একমাত্র সমাধান।”
তিনি নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের কথাও উল্লেখ করেন। এই সাতটি রাজ্য ল্যান্ডলকড হওয়ায় তাদের সমুদ্রপথে কোনো সংযোগ নেই। ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ যদি আঞ্চলি
ইউনূস আরও উল্লেখ করেন, আসিয়ান প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও আসিয়ানের সদস্য হওয়ার সুযোগ রাখে। তবে মিয়ানমার ইস্যু এখানে বড় চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান ছাড়া আঞ্চলিক সহযোগিতা পূর্ণতা পাবে না।
তিনি বলেন, “আমাদের মিয়ানমারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা জরুরি। একে অপরের সঙ্গে বিরোধ কারো উপকারে আসে না। রোহিঙ্গারা যদি চায়, তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে, নিজেদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসায় ফিরে যেতে পারবে।”
একটি পৃথক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আশ্বস্ত করেন যে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি একদিকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তব সমস্যাগুলোও উপেক্ষা করছেন না। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ভুয়া প্রচারণা যতই পরিস্থিতিকে জটিল করুক না কেন, তিনি বিশ্বাস করেন সহযোগিতা ও আলোচনার মাধ্যমেই এ অঞ্চলের অগ্রগতি সম্ভব।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



