ছবি: সংগৃহীত
প্রায় চার বছর আগে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় তিগ্রাইয়ের ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান হয়েছিল। একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রাণঘাতী এই সংঘাতের পর আবারও তিগ্রাইয়ে সহিংসতা শুরু হয়েছে।
তবে এবার যুদ্ধের মিত্র ও শত্রুর সমীকরণ বদলে গেছে।
তিগ্রাইয়ের সশস্ত্র যোদ্ধারা আবারও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অন্যদিকে, একসময় পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এখন একই পক্ষ হয়ে লড়ছে।
বুধবার তিগ্রাইয়ের বাহিনী কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা তিনটি বিমানবন্দর দখল করেছে বলে জানা গেছে।
একই সময়ে পার্শ্ববর্তী আমহারা ও আফার অঞ্চলেও লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে।
এর আগে, ২০২২ সালের চুক্তির মাধ্যমে তিগ্রাইয়ের কয়েক বছরের যুদ্ধের অবসান হয়েছিল। ওই যুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা কী কারণে শুরু হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও তিগ্রাইয়ের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে।
ইথিওপিয়া কীভাবে এই সংঘাতের দিকে গেল?
ইথিওপিয়ার বর্তমান সংঘাতের পেছনে রয়েছে দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ। একসময় দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি ছিল তিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ)।
তিগ্রাই জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় কম হলেও, টিপিএলএফ প্রায় তিন দশক ধরে ইথিওপিয়া শাসন করা রাজনৈতিক জোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরে কেন্দ্রীয় সরকার ও তিগ্রাইয়ের নেতৃত্বের মধ্যে ক্ষমতা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকে।
এই বিরোধ ধীরে ধীরে গভীর হয়ে একপর্যায়ে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। ২০১৮ সালে দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর আবি আহমেদ ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় এসে তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নেন এবং প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) সঙ্গে আবি সরকারের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। ২০১৯ সালে আবি পুরোনো ক্ষমতাসীন জোট ভেঙে প্রসপারিটি পার্টি গঠন করেন। টিপিএলএফ এই নতুন দলে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ইথিওপিয়ার জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হলে তিগ্রাইয়ের আঞ্চলিক সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তি উপেক্ষা করে নিজস্ব নির্বাচন আয়োজন করে। এতে দুই পক্ষের রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়।
এরপর ২০২০ সালের নভেম্বরে তিগ্রাইয়ের বাহিনী ওই অঞ্চলে থাকা ফেডারেল সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এর জবাবে আবি সরকার তিগ্রাইয়ে সেনা পাঠায়। পরে ইরিত্রিয়ার সেনা ও আমহারা অঞ্চলের যোদ্ধারাও ফেডারেল বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়।
প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। তিগ্রাইয়ের কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষও দেখা দেয়। একই সঙ্গে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
শান্তি চুক্তি কেন টিকল না?
২০২২ সালের শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তিগ্রাইয়ের যুদ্ধ শেষ হলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সমস্যার সমাধান হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী, তিগ্রাইয়ের সশস্ত্র বাহিনীর নিরস্ত্রীকরণ, ওই অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সহায়তা ও মৌলিক সেবা চালুর কথা ছিল। পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত তিগ্রাই পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠনের কথাও ছিল।
কিন্তু তিগ্রাই ও আমহারা—দুই অঞ্চলের দাবি করা ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ থেকেই যায়। যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিজ এলাকায় ফিরিয়ে আনা নিয়েও সমাধান হয়নি। এদিকে যুদ্ধে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করা ইরিত্রিয়ার সেনারা শান্তি চুক্তির অংশ ছিল না। ফলে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ইথিওপিয়ার ভূ-রাজনীতি গবেষক সুরাফেল গেতাহুন সিএনএনকে বলেন, ‘চুক্তিটি হঠাৎ করে ভেঙে পড়েনি। তিন বছর ধরে এটিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করা হয়েছে।’ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও তিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট, উভয় পক্ষকেই দায়ী করেছেন গবেষক সুরাফেল গেতাহুন।
তার মতে, কেন্দ্রীয় সরকার যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিজ এলাকায় ফিরিয়ে আনা এবং চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কিছু শর্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অন্যদিকে, টিপিএলএফ তিগ্রাইয়ের আঞ্চলিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ আবার নেওয়া এবং সামরিক বাহিনী পুনর্গঠনের মাধ্যমে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
এর পাশাপাশি টিপিএলএফের ভেতরেও নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। দলটির চেয়ারম্যান দেব্রেতসিওন গেব্রেমিখায়েল এবং তিগ্রাইয়ের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রধান রেদাকে ঘিরে দুটি পক্ষ তৈরি হয়।
পরে গেব্রেমিখায়েলের পক্ষ রেদাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ তিগ্রাইয়ের জন্য নতুন একজন অন্তর্বর্তী নেতা নিয়োগ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, টিপিএলএফের এই অভ্যন্তরীণ বিভক্তিও শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করে দেয়।
গেব্রেমিখায়েলের নেতৃত্বাধীন টিপিএলএফ গোষ্ঠী তিগ্রাইয়ের আঞ্চলিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এক মাস পর নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারকে সরিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠনের লক্ষ্য নিয়ে আরো ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে এই জোট করেছে টিপিএলএফ।
গেব্রেমিখায়েলের গোষ্ঠী তিগ্রাইয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর যুদ্ধের আগের আঞ্চলিক আইনসভা পুনর্বহাল করে। একই সঙ্গে গেব্রেমিখায়েলকে তিগ্রাইয়ের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট করা হয়।
টিপিএলএফের মুখপাত্র মাইকেল আসগেডম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, জোটের সদস্যরা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে একসঙ্গে কাজ করবে। প্রিটোরিয়া শান্তি চুক্তির সঙ্গে এই জোটের সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, চুক্তিটি ‘আর কার্যকর নয়।’
নতুন জোটের অন্যতম সদস্য আমহারা ফানো ন্যাশনাল মুভমেন্ট। আগের যুদ্ধে তারা টিপিএলএফের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে লড়াই করেছিল। তবে ২০২৩ সালে তারা আবি সরকারের বিরোধিতায় যায়।
জোটে আরো রয়েছে ওরোমো লিবারেশন আর্মি (ওএলএ), যারা দীর্ঘদিন ধরে ওরোমিয়া অঞ্চলে আবি সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করে আসছে। ফলে একসময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি গোষ্ঠীর একসঙ্গে জোট গঠন ইথিওপিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রয়টার্স বুধবার জানিয়েছে, তিগ্রাইয়ের বাহিনী আমহারা অঞ্চলে ফানো গোষ্ঠী এবং আফার অঞ্চলের একটি স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে লড়াই করছে। তবে এই জোট কতদিন টিকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইথিওপিয়ার ভূ-রাজনীতি গবেষক সুরাফেল গেতাহুন।
গেতাহুন বলেন, বিশেষ করে পশ্চিম তিগ্রাইয়ের মতো বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে টিপিএলএফ ও ফানোর মধ্যে এখনও মতবিরোধ রয়েছে। এ ছাড়া জোটের সদস্যদের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যও এক নয়। তার মতে, এটি স্থায়ী রাজনৈতিক জোট নয়, বরং একটি অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সাময়িক জোট।
প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের মুখপাত্র বিলেনে সেয়ুম সোমবার রয়টার্সকে বলেন, এসব গোষ্ঠী ইরিত্রিয়ার আর্থিক সহায়তায় আগেই একসঙ্গে কাজ করছিল। তবে ইরিত্রিয়া সরকার ইথিওপিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে।
এদিকে আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ) বুধবার তিগ্রাই বাহিনীর বিমানবন্দর দখলের ঘটনাকে ২০২২ সালের প্রিটোরিয়া শান্তি চুক্তির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি সব পক্ষকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
শান্তি প্রক্রিয়া পুনরায় এগিয়ে নিতে নাইজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ওলুসেগুন ওবাসাঞ্জোর সহায়তাও চেয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়ন। ২০২২ সালের শান্তি চুক্তিতে মধ্যস্থতায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
যুদ্ধ আরো ছড়িয়ে যেতে পারে?
তিগ্রাই এখনও আগের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অনেক এলাকায় পুনর্গঠনের কাজ চলছে এবং যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত বহু মানুষ এখনও নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেননি। এর মধ্যেই নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
ইথিওপিয়া এরই মধ্যে আমহারা ও ওরোমিয়া অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত মোকাবিলা করছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি বলছে, টিপিএলএফের সঙ্গে নতুন করে লড়াই শুরুর আগেই দেশটির ফেডারেল বাহিনী বিভিন্ন সংঘাতে ব্যস্ত ছিল।
তবে নতুন জোটে থাকা সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা এক নয়। এসিএলইডি-এর মতে, কয়েকটি গোষ্ঠীর বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর মতো সংগঠন বা পর্যাপ্ত সদস্য নেই। আবার কিছু গোষ্ঠী মূলত নিজেদের স্থানীয় এলাকাতেই সক্রিয়।
এর পাশাপাশি ইরিত্রিয়ার সেনাবাহিনীও নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার নিয়ে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। বিশেষ করে ইরিত্রিয়ার আসাব বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে ইথিওপিয়ার আগ্রহ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন ইথিওপিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যা সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে। এদিকে অঞ্চলটি এমনিতেই নানা সংকটে রয়েছে। পাশের সুদানে যুদ্ধ চলছে। একই সঙ্গে নীল নদ নিয়ে ইথিওপিয়া, মিসর ও সুদানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
গবেষক সুরাফেল গেতাহুন সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ আগের ২০২০-২০২২ সালের সংঘাতের চেয়েও বেশি প্রাণঘাতী ও বিস্তৃত হতে পারে। সংকট সমাধানের জন্য আলোচনাই এখন সবচেয়ে কার্যকর পথ বলে তিনি জানান।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



