ছবি: সংগৃহীত
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য ঘোষিত ৫ শতাংশ করছাড় সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি ও কারিগরি জটিলতা তৈরি হয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহে গতি আনতে এবং করদাতাদের সময়মতো ই-রিটার্ন বা রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে রিটার্ন জমাদানকারীদের সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর মওকুফের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু এনবিআরের বেঁধে দেওয়া অদ্ভুত হিসাব পদ্ধতি এবং আয়কর অধ্যাদেশের ভাষার কারণে এখন নিয়মিত ও আগাম করদাতারা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। পুরো বছরের মোট করের ওপর এই সুবিধা না দিয়ে কেবল ‘রিটার্ন দাখিলের সময় পরিশোধিত অর্থের’ ওপর ছাড় হিসাব করায় বিপুলসংখ্যক করদাতা ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এনবিআরের সংশোধিত পরিপত্র ও আয়কর আইন অনুযায়ী, কোনো করদাতা যদি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাঁর বার্ষিক রিটার্ন জমা দেন, তবে তিনি পরিশোধযোগ্য আয়করের ওপর ৫ শতাংশ (সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত) ছাড় পাবেন। কিন্তু মূল গোলমালটি বেঁধেছে ‘পরিশোধযোগ্য কর’ শব্দটির সংজ্ঞায়নে। এনবিআরের ডিজিটাল সিস্টেম ও আয়কর আইন অনুসারে, রিটার্ন জমা দেওয়ার দিনে ব্যাংক, চালানের মাধ্যমে বা অনলাইনে যে পরিমাণ নতুন অর্থ কর হিসাবে জমা হবে, কেবল সেই টাকার ওপরই ৫ শতাংশ ছাড় মিলবে।
বাস্তব পরিস্থিতি হলো, ব্যাংক আমানতের সুদের ওপর উৎস কর (TDS), বেতনের ওপর কাটা পে-রোল ট্যাক্স, গাড়ি কেনাবেচা, ডিপিএস বা জমি নিবন্ধনের সময় কাটা উৎস কর, এমনকি আগাম কর (Advance Tax) হিসেবে সাধারণ করদাতারা পুরো বছরজুড়েই এনবিআরের রাজকোষে অর্থ জমা দিয়ে আসেন। ফলে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর মাসে যখন একজন সচেতন করদাতা রিটার্ন দাখিল করছেন, তখন পুরো হিসাবের পর তাঁর অতিরিক্ত আর খুব একটা টাকা জমা দিতে হচ্ছে না। কিন্তু কারণবশত তাঁর পুরো বছরের কর যদি ১ লাখ টাকাও হয় এবং তিনি ইতোমধ্যে আগাম কর হিসেবে ৯০ হাজার টাকা জমা দিয়ে থাকেন, তবে সেপ্টেম্বর মাসে তিনি অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা জমা দেওয়ার সময় মাত্র ৫০০ টাকা (১০ হাজার টাকার ৫%) ছাড় পাচ্ছেন। অন্যদিকে, সারা বছর এক টাকাও উৎস কর বা আগাম কর না দিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে একবারে ১ লাখ টাকা কর পরিশোধকারী ব্যক্তি সরাসরি ৫ হাজার টাকা (১ লাখ টাকার ৫%) মওকুফ পেয়ে যাচ্ছেন।
ফলে পুরো বছর ধরে সততার সঙ্গে এনবিআরকে নিয়মিত রাজস্ব জুগিয়ে আসা করদাতারা এখন নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। আয়কর আইনজীবীরা বলছেন, এই নীতি সরাসরি বৈষম্যমূলক এবং এনবিআরের নিজের নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, আগাম করদাতারা সরকারকে সারা বছর টাকা ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছেন, অথচ ছাড় পাওয়ার বেলায় তাঁরাই বঞ্চিত হচ্ছেন। সমাধান হিসেবে আইনজীবীরা দাবি জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাসে জমা দেওয়া অর্থের ওপর নয়, বরং একজন করদাতার পুরো অর্থবছরের 'মোট নিট কর দায়' (Total Tax Liability)-এর ওপর ভিত্তি করে ৫ শতাংশ ছাড় হিসাব করা উচিত।
রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে কর কর্মকর্তাদের মধ্যেও আলোচনা চলছে। এনবিআরের শীর্ষপর্যায়ের একজন জ্যেষ্ঠ আয়কর কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, আইনি ভাষার কারণে বিষয়টি সাধারণ করদাতাদের জন্য কিছুটা জটিল এবং বৈষম্যমূলক হয়ে পড়েছে। তবে এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং করদাতাদের ক্ষোভ নিরসনে আগামী সপ্তাহেই এ বিষয়ে এনবিআর থেকে সংশোধিত কোনো ব্যাখ্যা বা নীতিগত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এনবিআরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টে মোট রিটার্ন জমা পড়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে সর্বমোট ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার করদাতা তাঁদের আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন। এনবিআর আশা করছে, ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সংখ্যা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ই-রিটার্ন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অনলাইন ও স্বচ্ছ করতে বর্তমানে এনবিআর প্রতিটি করদাতার জন্য একটি স্বতন্ত্র 'ডিজিটাল প্রোফাইল' তৈরির কাজ চালাচ্ছে। এই প্রোফাইলে কোনো করদাতার উৎস কর, অগ্রিম করের তথ্য ও চূড়ান্ত দেনা-পাওনার সুনির্দিষ্ট ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগৃহীত থাকবে। চালানের জটিলতা কাটাতে এবং ভবিষ্যতে সঠিকভাবে করছাড়ের হিসাব নির্ধারণ করতে এই ডিজিটাল প্রোফাইলই মূল ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এখন দেখার বিষয়, আগামী সপ্তাহের সম্ভাব্য সংশোধনীতে এনবিআর সাধারণ করদাতাদের এই বৈষম্য নিরসন করে পুরো বছরের আয়করের ওপর সুবিধাটি প্রদান করে কি না।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



