ছবি: সংগৃহীত
দেশের কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে ঋণ বিতরণে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ সময়ে মোট ৭০ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ। তবে একই সময়ে ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ এখনও রয়ে গেছে।
শুধু আগের বছরের তুলনায় নয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তুলনায়ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঋণ বিতরণে বড় ধরনের গতি এসেছে। প্রথম প্রান্তিকে বিতরণ হয়েছিল ৪৮ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক প্রান্তিকের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। খাতভিত্তিক তথ্য বলছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ দিয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। তারা বিতরণ করেছে ৫৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণের ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, বিশেষায়িত ব্যাংক ২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা, বিদেশি ব্যাংক এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ২ হাজার ৮৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সিএমএসএমই খাতে মোট স্থিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ৩ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা; ফলে বছরে স্থিত ঋণ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। একই সময়ে দেশের মোট স্থিত ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা, যার ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশই সিএমএসএমই খাতের দখলে। তবে ঋণ বিতরণ বাড়লেও আদায়ের চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ খাত থেকে ঋণ আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৫৭ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা—অর্থাৎ এক বছরে আদায় কমেছে ১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। এর আগে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও ঋণ আদায়ে বড় ধরনের পতন ঘটে, তখন আদায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৩৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকায় নেমে আসে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, সিএমএসএমই খাতে মোট স্থিত ঋণের ৭৩ দশমিক ৩৮ শতাংশই এখন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে। ফলে এ খাতে অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে তাদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। এর আগে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। ওই অর্থবছরে মোট বিতরণ নেমে আসে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায়, যেখানে আগের অর্থবছরে বিতরণ হয়েছিল ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানের প্রভাবেই ঋণপ্রবাহ কমে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
তবে সিএমএসএমই খাতে স্থিত ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে স্থিত ঋণ ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকায় এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা আরও বেড়ে ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা গেলে এ খাতে ঋণ প্রবাহের ইতিবাচক ধারা আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি ঋণ আদায় বাড়াতে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)


