ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগরে এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় ট্রেনের ধাক্কায় সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশার চার যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক মা ও তার শিশু সন্তান, একজন অটোরিকশাচালক এবং আরও একজন নারী। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর স্থানীয় জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে আরেকটি ট্রেন আটকে দেয়।
শনিবার (২ আগস্ট) দুপুর সোয়া ১টার দিকে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী একটি ট্রেন রশিদনগরের ধলিরছড়া রেলক্রসিং এলাকায় পৌঁছালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৈয়বুর রহমান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কক্সবাজারের আইনিক রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ধলিরছড়া রেলক্রসিংয়ে পৌঁছায়। ঠিক সেই সময় রেললাইন পার হচ্ছিল একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশা। ওই অটোরিকশাটি ভারুয়াখালীমুখী ছিল বলে জানান স্থানীয়রা। রেলক্রসিং পার হওয়ার মুহূর্তে দ্রুতগতির ট্রেনটি সিএনজিকে সজোরে ধাক্কা দিলে তা দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অটোরিকশার চালক হাবিব উল্লাহ, ঈদগাঁও উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের পূর্ব গোমাতলী এলাকার নাজির হোসেনের স্ত্রী মরিয়ম আক্তার (৪৫), তার শিশু কন্যা এবং এক অজ্ঞাত নারী। পুলিশ জানায়, নিহত নারীর পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। মরদেহগুলো ঘটনাস্থল থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে।
রশিদনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক মাসুম বলেন, “দুর্ঘটনার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, অটোরিকশার ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। ট্রেনটি ধাক্কা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। স্থানীয় মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা কক্সবাজারগামী ‘সৈকত এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি সেখানে আটকে রাখে।”
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে রেললাইনের উপর অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। ফলে সৈকত এক্সপ্রেস ট্রেনটি থেমে যায়। উত্তেজিত জনতা মরদেহ রেললাইনের পাশে রেখে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং ট্রেনের চালকসহ রেল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রতিবাদ জানাতে থাকে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. জসীম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “পুলিশ ইতোমধ্যে চারটি মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে কাজ করছে। আটকে থাকা ট্রেনটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করা হচ্ছে।”
প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, ধলিরছড়া রেলক্রসিং এলাকায় কোনো গেটম্যান বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এ রেলক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বহুবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করেন। তবে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল স্পষ্ট। তারা অবিলম্বে রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগ এবং সুরক্ষিত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এই ঘটনায় কক্সবাজারের জনমনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবারে চলছে আহাজারি। অনেকেই দুর্ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা দেখে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অবহেলার প্রমাণ মিললে রেলওয়ের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ঘটনায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।
এ ধরনের রেলক্রসিং এলাকায় নিয়মিত গেটম্যান না থাকার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায় বলে জানান রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা। তারা জানান, দ্রুত সব অনিরাপদ রেলক্রসিং চিহ্নিত করে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, তা না হলে এমন প্রাণহানি বারবার ঘটতেই থাকবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



