ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল, আধুনিক এবং হয়রানিমুক্ত করতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রপ্তানির উদ্দেশ্যে বন্দরে আনা পণ্য কোনো কারণে জাহাজে তোলা সম্ভব না হলে—যা বাণিজ্যিকভাবে 'সাট-আউট' (Shut-out) নামে পরিচিত—সেই সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তি এবং পূর্বের বিল অব এক্সপোর্ট (Bill of Export) বাতিলের পুরো প্রক্রিয়া আমূল বদলে ফেলা হয়েছে। গত ১২ জুলাই জারি করা এক বিশেষ অফিস আদেশের মাধ্যমে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এই নতুন ও সহজীকৃত কার্যপ্রণালী চালু করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানিকারকদের একটি বড় দাবি ছিল কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইল চালাচালির সময় কমিয়ে আনা। নতুন এই নির্দেশনার ফলে এখন থেকে স্বয়ং কমিশনারের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কাস্টমস কর্মকর্তারাই সরাসরি কাস্টমসের কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে’ (Asycuda World System) ঢুকে বিল অব এক্সপোর্ট বাতিলের অনুমতি দিতে পারবেন। এর ফলে ব্যবসায়ীদের আর টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে হবে না, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে অভূতপূর্বভাবে দ্রুত ও সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন প্রক্রিয়ার?
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা বাস্তবতায় প্রায়শই রপ্তানিকারকরা পণ্য বন্দরে নিয়ে আসার পর বিভিন্ন সংকটে পড়েন। কখনো ক্রেতার (Buyer) হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, কখনো জাহাজের শিডিউল বিপর্যয়, আবার কখনো অন্য কোনো বিশেষ কারণে আগের রপ্তানি ঘোষণা বা ডকুমেন্ট সংশোধন করার প্রয়োজন পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকদের অন্য কোনো জাহাজে, ভিন্ন কোনো কাস্টমস হাউসের মাধ্যমে কিংবা সম্পূর্ণ নতুন একটি বিল অব এক্সপোর্টের অধীনে পণ্য রপ্তানি সম্পন্ন করতে হয়। কিন্তু জটিলতা তৈরি হতো তখনই, যখন দেখা যেত পুরোনো বা আগের বিল অব এক্সপোর্টটি সিস্টেমে সচল বা কার্যকর অবস্থায় রয়ে গেছে। একই চালানের বিপরীতে একাধিক বিল অব এক্সপোর্ট সক্রিয় থাকার কারণে সিস্টেমে নানা জটিলতা তৈরি হতো এবং রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকিও থেকে যেত। এই পুরোনো ও অকার্যকর বিল অব এক্সপোর্ট দ্রুত বাতিলের জন্য একটি সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ ও বিকেন্দ্রীকৃত (Decentralized) প্রক্রিয়ার অভাব দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল, যা এবার এই আদেশের মাধ্যমে দূর করা হলো।
নতুন নিয়মে যেভাবে সম্পন্ন হবে আবেদন ও যাচাই
নতুন অফিস আদেশ অনুযায়ী, এখন থেকে সাট-আউট আবেদন নিষ্পত্তির জন্য রপ্তানিকারক বা তাদের মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্টকে সুনির্দিষ্ট কিছু নথিপত্রসহ আবেদন করতে হবে। আবেদনের সাথে যেসব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে তার একটি তালিকাও কাস্টমস স্পষ্ট করে দিয়েছে:
-
মূল বিল অব এক্সপোর্ট (Bill of Export)
-
বাণিজ্যিক ইনভয়েস (Commercial Invoice)
-
প্যাকিং লিস্ট (Packing List)
-
শিপিং বিল (Shipping Bill)
-
পণ্য জাহাজে না ওঠার সপক্ষে সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট বা কর্তৃপক্ষের চিঠিপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি।
আবেদন জমা পড়ার পর কাস্টমসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার কিংবা রাজস্ব কর্মকর্তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দাখিলকৃত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করবেন। জালিয়াতি বা কোনো ধরনের অসঙ্গতি এড়াতে প্রয়োজনে তারা বন্দরের গেটপাস, কনটেইনার বা পণ্যের বর্তমান অবস্থান এবং কাস্টমসের নিজস্ব নথিপত্রের সাথে তথ্য মিলিয়ে দেখার (Cross-check) কাজ সম্পন্ন করবেন।
চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও সিস্টেম আপডেট
কাগজপত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হওয়ার পর, প্রতিবেদনটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কমিশনারের কাছে পাঠানো হবে। কমিশনারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার সাথে সাথেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কাস্টমস কর্মকর্তা স্বয়ংক্রিয় অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে প্রবেশ করে পুরোনো বিল অব এক্সপোর্টটি স্থায়ীভাবে বাতিল (Cancel) করে দেবেন। এর ঠিক পরপরই সাট-আউট সংক্রান্ত মূল আবেদনটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘোষণা করা হবে।
বাণিজ্যে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব
চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, এই নতুন ও বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থা চালুর ফলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি কার্যক্রমে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এর ইতিবাচক প্রভাবগুলো হবে সুদূরপ্রসারী:
-
ডুপ্লিকেশন বন্ধ: একই পণ্যের চালানের বিপরীতে একাধিক বিল অব এক্সপোর্ট সিস্টেমে সচল থাকার যে দীর্ঘদিনের টেকনিক্যাল সমস্যা ছিল, তা সম্পূর্ণ দূর হবে।
-
সময় ও খরচ সাশ্রয়: কাগুজে ফাইল চালাচালি ও দীর্ঘসূত্রতা কমে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়ানো সম্ভব হবে। এতে লিড-টাইম (Lead time) কমবে, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে।
-
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে এবং সুনির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের সরাসরি দায়িত্বে সম্পন্ন হওয়ায় কাস্টমসের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে। কোনো স্তরে ফাইল আটকে রাখার সুযোগ থাকবে না।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও কাস্টমস হাউসের এই আধুনিকীকরণ ও ব্যবসাবান্ধব নীতি পোশাক খাতসহ সব ধরনের রপ্তানি শিল্পে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে এবং সরকারের ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ বা ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



