ছবি: সংগৃহীত
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) অর্থনীতির রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়া এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশের জন্য এফডিআই আকর্ষণ এখন সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) তাদের ‘এফডিআই রিপোর্ট-২০২৬’-এ এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ফিকির এফডিআই সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদনে ফিকি উল্লেখ করেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক ১৫ বিলিয়ন ডলার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে এফডিআই আসছে দুই বিলিয়ন ডলারেরও কম। এ ছাড়া এফডিআই-জিডিপি অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে আড়াই শতাংশে উন্নীত করার কথা বলছে ফিকি।
আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
প্রতিবেদনটিতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সক্ষমতার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দেখা যায়—লজিস্টিকস, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, শিল্পনীতি, বাণিজ্য একত্রীকরণ ও করব্যবস্থাসহ ছয়টি প্রধান সূচকের মধ্যে পাঁচটিতেই বাংলাদেশের অবস্থান ‘দুর্বল’। লজিস্টিকস ও বাণিজ্য সহজীকরণ সূচকে ভারত ও ভিয়েতনাম ‘শক্তিশালী’ অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে; এ ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার অবস্থান ‘মধ্যম’। লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে ভারতের অবস্থান ৩৮তম এবং ভিয়েতনামের ৪৩তম হলেও বাংলাদেশ রয়েছে ৮৮তম স্থানে। বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সুশাসনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়—ভিয়েতনাম ও ভারত যেখানে ‘শক্তিশালী’, সেখানে বাংলাদেশ ‘দুর্বল’। ভিয়েতনাম ২০২০ সালের আধুনিক বিনিয়োগ আইন প্রণয়ন করলেও বাংলাদেশ এখনো ১৯৮০ সালের পুরোনো ‘এফপিআইপিপিএ’ আইনের ওপর নির্ভরশীল।
শিল্পনীতির ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ‘শক্তিশালী’ এবং ভারত ও ইন্দোনেশিয়া ‘মধ্যম’ অবস্থানে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রেও ‘দুর্বল’ অবস্থানে। শিল্পে উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভারত বা ভিয়েতনামের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বাণিজ্য একত্রীকরণ ও এফটিএ নেটওয়ার্ক সূচকে ভিয়েতনাম ‘শক্তিশালী’। বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া ‘দুর্বল’। বাণিজ্য উন্মুক্ততা সূচকে ভিয়েতনামের অবস্থান ১৩তম হলেও বাংলাদেশ ১৫৫তম স্থানে রয়েছে।
বিনিয়োগ প্রণোদনা ও করব্যবস্থার সূচকেও একই প্রবণতা দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া ‘মধ্যম’ অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার অবস্থান ‘দুর্বল’। দেশে প্রাতিষ্ঠানিক করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর করহার ৪৩ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা বিনিয়োগের জন্য বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশ ‘মধ্যম’ অবস্থানে থেকে কম্বোডিয়ার সমপর্যায়ে রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে। ভিয়েতনামে ৪৪টি এবং ভারতে ২৭৬টি কার্যকর অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকলেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা এখনো মাত্র ১০টি।
এফডিআই বদলে দিতে পারে অর্থনীতি
ফিকির মতে, এফডিআই আকর্ষণ করা গেলে কেবল বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়াবে না, বরং এটি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এটি দেশের শিল্প খাতের বৈচিত্র্যকরণে সাহায্য করবে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের ঝুঁকি কমাতে এফডিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা এবং মানদণ্ড শিখতে সাহায্য করবে, যা প্রকারান্তরে দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশেরই উন্নয়ন ঘটাবে।
কোন খাতে আসতে পারে বিনিয়োগ
ফিকির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথাগত তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে ওষুধ, আইটি ও ডিজিটাল সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং হালকা প্রকৌশল খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চামড়াজাত পণ্য খাতও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আকর্ষণ করছে। বর্তমানে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, চীন, সিঙ্গাপুর, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রধান উৎস হলেও ভবিষ্যতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এবং জাপান থেকেও বড় ধরনের বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জাপানিজ ইকোনমিক জোন এবং কোরিয়ান বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা দেশের এফডিআই প্রবাহে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



