ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে উৎসে কর তদারকি জোরদার করার লক্ষ্যে জারি করা একটি নতুন নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে দেশের ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে তীব্র অসন্তোষ ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৯ জুলাই এনবিআর দেশের সব কর অঞ্চলে একটি বিশেষ নির্দেশনাপত্র পাঠায়, যার মূল উদ্দেশ্য কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উৎসে কর আদায়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা। তবে এই উদ্যোগের পরপরই দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, এই নির্দেশনার ফলে কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসা পরিচালনার স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।
কর কর্মকর্তাদের যে ৫টি বিশেষ ক্ষমতা দিল এনবিআর
উৎসে কর তদারকি ও আদায় প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করার অজুহাতে এনবিআর মূলত আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭ ধারার ওপর ভিত্তি করে কর কর্মকর্তাদের পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ও অবারিত ক্ষমতা দিয়েছে। এই নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
বাধাহীন প্রবেশ ও পরিদর্শন: কর কর্মকর্তারা দেশের যেকোনো বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে, ব্যবসাকেন্দ্রে কিংবা প্রধান দপ্তরে কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সম্পূর্ণ বিনা বাধায় প্রবেশ এবং সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন।
-
নথিপত্র তলব ও পরীক্ষা: সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবের বই, খরচের ভাউচার, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত যেকোনো নথিপত্র যেকোনো সময় তলব এবং পরীক্ষা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কর্মকর্তাদের।
-
ডিজিটাল তথ্য ও সার্ভারে প্রবেশ: আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য যেখানে ডিজিটাল উপায়ে সংরক্ষিত থাকে, সেখানেও কর কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেম, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড বা যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সংরক্ষিত তথ্য পরীক্ষা করতে পারবেন। প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভেঙে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও তাদের দেওয়া হয়েছে।
-
নথিপত্র ও ডিভাইস সাময়িক জব্দ: উৎসে কর কাটার সত্যতা নিশ্চিত করার স্বার্থে কর কর্মকর্তারা যদি প্রয়োজন মনে করেন, তবে যেকোনো হিসাবের খাতা, নথিপত্র, ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা ডিভাইস সাময়িকভাবে জব্দ করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিতে পারবেন।
-
কপি সংগ্রহ ও সিলমোহর ব্যবহার: যেকোনো স্পর্শকাতর নথিপত্র, ডিজিটাল ইমেজ বা অ্যাকাউন্টের কপি সংগ্রহ করার পাশাপাশি সেগুলোতে নিজস্ব শনাক্তকরণ চিহ্ন বা অফিশিয়াল সিলমোহর ব্যবহার করতে পারবেন কর কর্মকর্তারা।
এনবিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কারভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, রাজস্ব আহরণের স্বার্থে পরিচালিত এই সকল কার্যক্রমে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে বা কর কর্মকর্তাদের সহযোগিতা না করলে আয়কর আইনের ১৪৭ (২) ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর জরিমানামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৮ শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠনের যৌথ প্রতিরোধ ও চিঠি
এনবিআরের এই কঠোর ও নজিরবিহীন নির্দেশনার বিরুদ্ধে দেশের ব্যবসা খাতের অভিভাবক ও শীর্ষ আটটি বাণিজ্য সংগঠন একযোগে মাঠে নেমেছে। গত বুধবার এই আটটি চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিরা যৌথভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তারা এই বিতর্কিত আদেশটিকে অবিলম্বে স্থগিত অথবা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
এই যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন দেশের অর্থনৈতিক খাতের দিকপাল ও ব্যবসায়ী নেতারা, যাদের মধ্যে রয়েছেন: ১. মাহবুবুর রহমান, সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি) ২. কামরান টি রহমান, সভাপতি, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড Industri (এমসিসিআই) ৩. মোহাম্মদ আমিরুল হক, সভাপতি, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) ৪. আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, সভাপতি, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) ৫. মাহমুদ হাসান খান, সভাপতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ৬. মোহাম্মদ হাতেম, সভাপতি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ৭. তাসকীন আহমেদ, সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ৮. মইনুল ইসলাম, সভাপতি, বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ)
ব্যবসায়ীদের যুক্তি ও আইনি প্রশ্ন
এনবিআর চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে ব্যবসায়ী নেতারা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে তাদের উদ্বেগ ও আপত্তির কারণগুলো তুলে ধরেছেন। তাদের মূল বক্তব্য হলো, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭ ধারাটির বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি কিংবা বৃহৎ—কোনো স্তরের ব্যবসায়ীরাই পূর্বে অবহিত ছিলেন না। এনবিআরের এই আকস্মিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারির পর পুরো উৎপাদন ও সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি চরম ভীতি, বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা চিঠিতে বেশ কিছু আইনি ও সাংবিধানিক বিষয়ও সামনে এনেছেন:
কোম্পানি আইনের লঙ্ঘন: কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী প্রতিটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রেকর্ডের একটি গোপনীয়তা বজায় রাখার আইনি অধিকার রয়েছে, যা এই নির্দেশনার ফলে চরমভাবে লঙ্ঘিত হবে।
বিনিয়োগ সুরক্ষার সংকট: বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৬ অনুযায়ী দেশে ব্যবসা পরিচালনার স্বাধীনতা এবং বিনিয়োগ সুরক্ষার যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, কর কর্মকর্তাদের এই বাধাহীন প্রবেশের ক্ষমতা তার পরিপন্থী।
সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন: দেশের সংবিধানের ৩১ ও ৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের যে আইনগত অধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এই আদেশ তার মৌলিক স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক।
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ও আস্থার সংকট
ব্যবসায়ীরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, তারা কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতাকে সব সময় সমর্থন করেন এবং নিয়মিত কর দিতে চান। তবে কর আদায়ের প্রক্রিয়াটি ভীতিমুক্ত হওয়া উচিত। করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক আস্থাশীল ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক না থাকলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।
চিঠিতে বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক লক্ষ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর এবং দেশের এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বর্তমানে স্থবির হয়ে থাকা অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। আর তার জন্য প্রয়োজন ব্যবসার আকার ও ধরন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা। এই পরিস্থিতিতে সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজ যদি পরস্পরকে আস্থায় না নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায়, তবে বেসরকারি বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়বে।
তাই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ব্যবসায়ী সমাজের মধ্য থেকে আকস্মিক তৈরি হওয়া আতঙ্ক ও ভীতি দূর করার লক্ষ্যে এনবিআরের এই বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তিটি অবিলম্বে স্থগিত বা প্রত্যাহার করার জন্য ব্যবসায়ী নেতারা সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



