ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন ব্যবস্থায় দেশভেদে ১০ শতাংশ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। আজ শুক্রবার থেকে এই শুল্ক কার্যকর হবে।
জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তর এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর কার্যকর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেনি বা সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এই শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে।
নতুন সিদ্ধান্তে ভারতকে ১০ শতাংশ শুল্কের তালিকায় রাখা হয়েছে। শুরুতে ভারতের জন্য ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন, শ্রমনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের গঠনমূলক আলোচনা এবং অগ্রগতির কারণে শেষ পর্যন্ত দেশটিকে কম হারের শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি দেশের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেসব দেশে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, অথবা যারা এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিংবা আংশিকভাবে ব্যবস্থা নিয়ে কিছু পণ্যের আমদানি বন্ধ করেছে, তাদের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
১০ শতাংশ শুল্কের এই তালিকায় রয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, জর্ডান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের যেসব পণ্য আগে থেকেই অন্য কারণে শুল্কমুক্ত নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্কের পাশাপাশি ১০ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে। এছাড়া অন্য দেশগুলোর জন্য শুল্কের হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন শুল্ক শুক্রবার থেকে কার্যকর হবে। এটি ভারত, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপানসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর প্রযোজ্য হবে। বৃহস্পতিবারের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর বলেছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে বা তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা অনুযায়ী, অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার অভিযোগে কোনো দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক বা অন্য বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশ্বাস, শুধু নৈতিক আহ্বান জানিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় একশ বছর ধরে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং দেশটি কঠোরভাবে সেই আইন বাস্তবায়ন করে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারদেরও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। গ্রিয়ার আরো বলেন, অনেক দেশ দ্রুত জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে, যা ইতিবাচক। তবে সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই সিদ্ধান্তের আগে চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(খ) ধারায় ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা যাচাই করা। তদন্ত চলাকালে ৪৫টির বেশি দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি একাধিক গণশুনানির আয়োজন করা হয় এবং ১ হাজার ৬০০টির বেশি লিখিত মতামত পর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাণিজ্য নীতির অন্যতম বড় পদক্ষেপ।
উল্লেখ্য যে, গত বছর ক্ষমতায় ফিরে এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত তথাকথিত ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপ করেছিলেন। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই শুল্কের বড় অংশ বাতিল করে দেয়। আদালতের মতে, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ওই শুল্ক আরোপ আইনসম্মত ছিল না। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন আইনি ভিত্তিতে শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা ব্যবহার করে নতুন শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা ব্যবহার করায় নতুন শুল্ক আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও টিকে থাকার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। কারণ অতীতেও ৩০১ ধারার আওতায় নেওয়া পদক্ষেপ আদালতে বহাল ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বিশ্বের ৬০টি অর্থনীতির পণ্যের ওপর নতুন এই শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন ১৫০ দিনের জন্য সব আমদানির ওপর অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক চালু করেছিল। সেই মেয়াদ আজ শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে শেষ হবে। ঠিক এরপরই নতুন ১০ ও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। তবে ইতোমধ্যে পথে থাকা বা পরিবহনে থাকা পণ্য ২৮ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত নতুন শুল্ক থেকে ছাড় পাবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



