ছবি: সংগৃহীত
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় দেশের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে। সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে মোট ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা একই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব সংগ্রহ। তবে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে।
রোববার এনবিআরের প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ, আমদানি কার্যক্রমে ওঠানামা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেও রাজস্ব আদায়ের গতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক খাতে সমন্বিত তৎপরতার ফলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে পৌঁছেছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই ১১ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে অতিরিক্ত ৩২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। শতাংশের হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ০২ শতাংশ। রাজস্ব প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ইতিবাচক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায়ের পরিমাণ এখনও অনেক কম।
চলতি অর্থবছরের জন্য এনবিআরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম ১১ মাসের জন্য আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃত আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের মাত্র ৮১ দশমিক ৫৮ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক হলেও বাজেট বাস্তবায়ন ও সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং ঋণ পরিশোধের বড় অংশই অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল। ফলে লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আদায়ের মধ্যে বড় ব্যবধান নীতিনির্ধারকদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনটি প্রধান রাজস্ব উৎসেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। কাস্টমস বা শুল্ক অনুবিভাগে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। আমদানি নির্ভর রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার কারণে কিছুটা চাপ থাকলেও কাস্টমস খাত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অনুবিভাগে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ০৫ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবাখাত থেকে আদায়কৃত ভ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই খাতে রাজস্ব সংগ্রহ বেড়েছে। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, অনলাইন তদারকি এবং করদাতাদের নিবন্ধন সম্প্রসারণের ফলে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে আয়কর খাতে। প্রথম ১১ মাসে আয়কর অনুবিভাগে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। উৎসে কর আদায় বৃদ্ধি, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, কর রিটার্ন জমাদানে উৎসাহমূলক উদ্যোগ এবং তদারকি জোরদারের কারণে আয়কর খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছে এনবিআর।
এদিকে অর্থবছরের শেষ মাস জুনেও রাজস্ব আদায়ের গতি অব্যাহত রয়েছে। জুন মাসের প্রথম ২০ দিনেই আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। এর ফলে ২০ জুন পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, কারণ এই পরিমাণ রাজস্ব ইতোমধ্যেই গত অর্থবছরের পুরো বছরের মোট রাজস্ব আদায়কে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই আগের বছরের বার্ষিক রাজস্ব সংগ্রহ অতিক্রম করেছে এনবিআর।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা আশা করছেন, জুন মাসের অবশিষ্ট ১০ দিনে আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। বাস্তবায়িত হলে এটিও হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড।
তবে সম্ভাব্য এই রেকর্ড অর্জিত হলেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ব্যবধান পুরোপুরি দূর হবে না। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে মোট আদায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাবে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহে রেকর্ড সৃষ্টি হলেও লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ বহাল থাকবে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশেষ উদ্যোগ হাতে নিয়েছে এনবিআর। সংস্থাটি জানিয়েছে, আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস—এই তিন অনুবিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পৃথক তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এসব টাস্কফোর্স নিয়মিতভাবে রাজস্ব সংগ্রহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য রাজস্ব উৎস চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
এনবিআরের দাবি, কর ফাঁকি শনাক্তকরণ কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট পরিচালনা, উৎসে কর ও ভ্যাট আদায়ের তদারকি বৃদ্ধি, বকেয়া আদায় কার্যক্রম জোরদার এবং দীর্ঘদিনের কর বিরোধ নিষ্পত্তিতে গতি আনার ফলে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ, তথ্যভিত্তিক নজরদারি এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সম্প্রসারিত হলে এবং করজাল বৃদ্ধি, স্বয়ংক্রিয়তা ও প্রশাসনিক সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব আদায়ে আরও বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে। তবে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে রাজস্ব আদায়ে নতুন রেকর্ড গড়লেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তবুও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা এবং অর্থবছরের শেষদিকে আদায়ের গতি বৃদ্ধি এনবিআরকে নতুন আশাবাদ দিচ্ছে। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা তৈরি হলেও লক্ষ্য ও অর্জনের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনা এখন সংস্থাটির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



