ছবি: সংগৃহীত
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ও ঝটিকা অভিযানের অংশ হিসেবে একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন চারটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে এক নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই ধারাবাহিক অভিযানে আকাশপথে আনা বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য আটক করা হয়। জব্দকৃত চালানের মধ্যে রয়েছে লুকানো স্বর্ণ, আমদানিনিষিদ্ধ পাকিস্তানি কসমেটিকস, বিপুল পরিমাণ শর্তসাপেক্ষ ওষুধ, বিদেশি মদ এবং দামি সিগারেট। সব মিলিয়ে এসব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ৪২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, বিমানবন্দরের সি-শিফটের কর্মকর্তারা বিশেষ সোর্সের মাধ্যমে অগ্রিম খবর পান যে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট ব্যবহার করে অবৈধ ও শর্তসাপেক্ষ আমদানিযোগ্য মালামাল শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে প্রবেশের চেষ্টা চলছে। এমন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গোয়েন্দা সদস্যরা ব্যাগেজ বেল্ট, ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং গ্রিন চ্যানেলসহ বিমানবন্দরের সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ও ছদ্মবেশে নজরদারি শুরু করেন।
কলম্বো ফ্লাইটে ট্রলির গোপন কুঠুরিতে স্বর্ণ ও ওষুধ
অভিযানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসের ইউএল১৮৯ ফ্লাইটে (কলম্বো–ঢাকা)। দুপুর আনুমানিক ১২টায় ফ্লাইটটি ল্যান্ড করার পর ইমিগ্রেশন ও ব্যাগেজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গ্রিন চ্যানেল পেরোনোর সময় ‘মেসার্স পারভেজ (MD PARVEZ)’ নামে এক যাত্রীর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে তাঁকে আটক করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মালামালের কথা অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গে থাকা ট্রলি ব্যাগে নিবিড় তল্লাশি চালানো হয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দেখেন, ট্রলিটির কাঠামো বিশেষভাবে পরিবর্তন করে গোপন স্থানে (কনসিলড) অত্যন্ত কৌশলে ১৩৩ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। শুধু স্বর্ণই নয়, তাঁর লাগেজ থেকে মিলিয়ে আরও ২ হাজার ৫৮৯ পিস ওষুধ উদ্ধার করা হয়, যা শর্তসাপেক্ষে আমদানিযোগ্য। এসব ওষুধের সপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় স্বর্ণ ও ওষুধ ডিএমের (ডিটেনশন মেমো) মাধ্যমে জব্দ করা হয়। কেবল এই এক যাত্রীর কাছ থেকেই ৩০ লাখ টাকার সমপরিমাণ অবৈধ পণ্য আটক করা সম্ভব হয়েছে।
এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটে বিদেশি মদ জব্দ
অন্যদিকে এয়ার ইন্ডিয়ার এআই২৩৭ ফ্লাইটে আসা জনি মিয়া নামে আরেক যাত্রীর ওপর গোয়েন্দাদের সন্দেহ জাগে। গ্রিন চ্যানেলে তাঁর ব্যাগেজ স্ক্যানিং ও বিস্তারিত তল্লাশির সময় উদ্ধার করা হয় ৬ লিটার ‘গ্র্যান্টস’ (Grants) ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ। দেশে মদ আমদানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত শুল্ককাঠামো ও কড়া নিয়মকানুন থাকলেও আইন অমান্য করে তা আনার দায়ে এগুলো জব্দ করা হয়। আটককৃত এই মদের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এমিরেটস ও ইউএস-বাংলা ফ্লাইটে কসমেটিকস ও সিগারেটের চালান
একই দিনে এমিরেটসের ইকে০৫৮৬ ফ্লাইটে দুবাই হয়ে আগত মো. মিজানুর রহমান নামে এক যাত্রীর ব্যাগেজ স্ক্যান করা হলে বেরিয়ে আসে ২৯ কার্টন অবৈধ বিদেশি সিগারেট এবং ৭০৮ পিস পাকিস্তানি ‘হোয়াইটিং সিরাম’। কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, এসব স্কিন কেয়ার সিরাম ও সিগারেট শুল্ক ফাঁকি দিয়ে প্রসাধন বাজারে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এই পণ্যগুলোর আনুমানিক মূল্য ৪ লাখ ৪৯ হাজার ১০০ টাকা।
এছাড়া, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিএস৩১৬ ফ্লাইটের যাত্রী সুমা বেগমের ব্যাগেজে অভিযান চালিয়ে পাওয়া যায় ৩০ কেজি বিপজ্জনক ও আমদানি-নিষিদ্ধ ‘গৌরি ক্রিম’। স্কিন ফেয়ারনেস ক্রিম হিসেবে পরিচিত এই পণ্যে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর কেমিক্যাল থাকার কারণে বাংলাদেশে এটি আনা ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জব্দকৃত এই প্রসাধনীর বাজারমূল্য প্রায় ৬ লাখ টাকা।
চোরাচালান প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স
১৫ আগস্ট পরিচালিত সমন্বিত এই চার অভিযানে সব মিলিয়ে ১৩৩ গ্রাম স্বর্ণ, ২,৫৮৯ পিস ওষুধ, ৫১ কার্টন সিগারেট, ৩১ কেজি নিষিদ্ধ ক্রিম, ৭০৮ পিস সিরাম ও ৬ লিটার মদ জব্দের চূড়ান্ত হিসাব দেয় সিআইআইডি। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোকে চোরাচালানের রুটে পরিণত করার অপচেষ্টা রুখে দিতে যাত্রী প্রোফাইলিং ও প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে কাস্টমস সূত্র জানায়। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ করে জব্দকৃত মালামাল কাস্টমসের গুদামে জমা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



