ছবি: সংগৃহীত
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম প্রধান উৎস মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আহরণের এই নেতিবাচক প্রবণতা অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি নির্ধারকদের চরম উদ্বেগে ফেলেছে। আকস্মিক এই রাজস্ব ঘাটতির জন্য সদ্য চালু করা ‘ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন’ পদ্ধতিকে সরাসরি দায়ী করছেন এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজস্ব বিশেষজ্ঞরা। নতুন এই ব্যবস্থার কারণে রাজস্ব আহরণে যে স্থবিরতা ও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে তড়িঘড়ি করে পুনরায় আগের মতো ‘মাসিক ভ্যাট রিটার্ন’ জমা ও কর পরিশোধের নিয়মে ফিরে যাওয়ার জোর চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এনবিআর ও প্রশাসনিক সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীদের সুবিধার মাশুল গুনছে রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ এবং করদাতাদের প্রশাসনিক ঝক্কি কমানোর লক্ষ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর (ত্রৈমাসিক) ভ্যাট রিটার্ন জমা এবং কর পরিশোধের সুযোগ চালু করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে প্রতি মাসের রিটার্ন জমা দেওয়ার বাড়তি চাপ কমানো। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো আকার ধারণ করেছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। রাজস্ব বোর্ডের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ত্রৈমাসিক ব্যবস্থার কারণে করদাতাদের ওপর তদারকি ও নিরীক্ষণ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় ভ্যাট ফাঁকি ও বকেয়া পড়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক রাজস্বে।
দুই মাসেই ঘাটতি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা এনবিআরের সংগৃহীত মোট রাজস্বের সিংহভাগ—প্রায় ৩৮ শতাংশই আসে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট সংগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অর্থবছরভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়:
-
জুলাই মাসের চিত্র: গত বছর জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের একই মাসে তা নেমে এসেছে ৯ হাজার ৩০২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ শুধু জুলাইয়েই ঘাটতি প্রায় ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।
-
আগস্ট মাসের চিত্র: আগস্ট মাসে রাজস্ব পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটেছে। গত বছরের আগস্টে ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা আদায় হলেও এবার আদায় হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা।
-
দুই মাসের সামগ্রিক চিত্র: দুই মাস মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে মোট ভ্যাট আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আদায় হয়েছিল ২২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। ফলে অর্থবছর শুরুর মাত্র ৬০ দিনের মাথায় ভ্যাট খাতেই বিশাল ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে—যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ২১ থেকে ২২ শতাংশ কম।
কীভাবে ফাঁক তৈরি হলো: বড় বনাম ছোট ব্যবসায়ী রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভ্যাট পরিশোধের নিয়ম পরিবর্তনের সুফল ও কুফল দুভাবেই রাজস্ব আদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে:
-
বড় করপোরেটদের সুবিধা ও অর্থ খাটানো: এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অধীনে থাকা দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোই মোট ভ্যাটের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ যোগান দিয়ে থাকে। আগের নিয়মে চালান ইস্যু করার আগেই ভ্যাট ট্রেজারিতে জমা দিতে হতো। পরবর্তীতে ৩০ দিন সময় দিয়ে পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দেওয়ার নিয়ম চালু হয়। কিন্তু বর্তমান ত্রৈমাসিক নিয়মে তিন মাস বা ৯০ দিন সময় পাওয়ায় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা বিপুল পরিমাণ ভ্যাটের টাকা তিন মাস নিজের কাছেই রেখে দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই টাকা ট্রেজারিতে না দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) করে সুদের মুনাফা তোলা হচ্ছে কিংবা নিজেদের অন্যান্য ব্যবসায়িক খাতে খাটিয়ে ক্যাশ ফ্লো বাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
-
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর মানসিক ও আর্থিক বোঝা: অন্যদিকে, বড় ব্যবসায়ীরা অর্থ খাটিয়ে লাভবান হলেও তিন মাসের এই ব্যবস্থা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য চরম বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি মাসে ছোট অঙ্কের ভ্যাট জমা দেওয়া তাদের জন্য সহজ ছিল। কিন্তু তিন মাস জমানোর পর একবারে একটি মোটা অঙ্কের টাকা সরকারি ট্রেজারিতে জমা দেওয়া ছোট ব্যবসায়ীদের পক্ষে এককালীন নগদ অর্থের সংকটে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত প্রহর: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদনের অপেক্ষা
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদার করতে এবং রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নীতি নির্ধারক জানান, আগে প্রতি মাসে বিভাগ, সার্কেল ও ইউনিটভিত্তিক নিখুঁত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও মনিটরিং করা সম্ভব হতো। ত্রৈমাসিক ব্যবস্থার কারণে সেই নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে গেছে। ফলে রাজস্ব ঝুঁকি এড়াতে আবারও পুরোনো মাসিক রিটার্ন ও পরিশোধ ব্যবস্থায় ফিরে যেতে আনুষঙ্গিক নীতিগত ও প্রশাসনিক সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। বর্তমানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফাইল পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদন ও সবুজ সংকেত পেলেই যেকোনো মুহূর্তে এ সংক্রান্ত নতুন আদেশ জারি হতে পারে।
তবে এনবিআরের অন্য একটি উচ্চপদস্থ সূত্র কিছুটা ভিন্ন ও সতর্ক মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এখনই তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত বদলানো ঠিক নাও হতে পারে। যেহেতু ব্যবসায়ীদের জন্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম ত্রৈমাসিকের ভ্যাট রিটার্ন দেওয়ার সময়সীমা কার্যকর রয়েছে, তাই সেপ্টেম্বর পার হয়ে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে গিয়ে প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে। তখন বোঝা যাবে এটি স্রেফ সময়সূচির বিলম্ব নাকি স্থায়ী ঘাটতি।
নীতি পরিবর্তন ও মাঠপর্যায়ের ভোগান্তি নিয়ে ব্যবসায়ীদের তোপ সরকারের এই ঘন ঘন নিয়ম বদলানোর আভাসে ব্যবসায়ী মহলে প্রবল অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতামত প্রধানত দুটি দিককে স্পর্শ করছে:
১. নীতির অস্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগে আঘাত: দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা মো. ফজলুল হক সরকারের এই দোলাচল নীতি নিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “বিনিয়োগ ও স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো নীতিগত স্থায়িত্ব। মাত্র তিন মাসের মাথায় সরকারি নীতি বদলে ফেলা কখনোই কোনো ভালো বার বার্তা দেয় না। ঘন ঘন নিয়ম পরিবর্তন হলে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।” তিনি আরও যোগ করেন, এই পরিবর্তন বাতিল হলে হয়তো কিছু ব্যবসায়ী লাভবান হবেন আর কিছু ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কিন্তু সার্বিক নীতিগত আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়। তবে সরকারের যদি তাৎক্ষণিকভাবে প্রচণ্ড অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজস্ব আহরণের স্বার্থে তারা মাসিক পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে।
২. মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি ও ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ বিতর্ক: নিয়ম পরিবর্তনের চেয়ে মাঠপর্যায়ের এনবিআর কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা ও দুর্নীতি দমনকে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীরা যখনই ভ্যাট দিতে যান বা কর্মকর্তারা যখন ভ্যাটের তাগাদায় আসেন, তখনই তথাকথিত ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ করতে হয়। এই ‘শুভেচ্ছা’র আড়ালে কী লেনদেন হয়, তা দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে এনবিআর—সবারই জানা।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তিন মাসের রিটার্ন ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীদের অন্তত তিন মাস পর পর কর্মকর্তাদের এই ‘শুভেচ্ছা’ বা অনৈতিক খরচ মেটাতে হতো। এখন আবার মাসিক রিটার্ন চালু হলে ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসেই এই অতিরিক্ত খরচের খড়্গ বইতে হবে। হেলাল উদ্দিনের মতে, ঘন ঘন রিটার্নের নিয়ম পরিবর্তন না করে এনবিআর যদি রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা আনে এবং কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে পারে, তবে বর্তমান ব্যবস্থার ভেতরেই রাজস্ব বহুগুণ বৃদ্ধি সম্ভব।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



