ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় আয় বাড়াতে এবং কর ফাঁকির পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে এক যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দেশের আয়কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির অংশ হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিস্তৃত পরিসরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে 'উৎসে কর' (Tax Deducted at Source - TDS) কর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি আয়কর আইনের বিশেষ ধারার অর্পিত ক্ষমতাবলে এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদেশ জারি করে দেশের শীর্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এনবিআর।
আদেশ সূত্রে জানা গেছে, দেশের সকল সরকারি দপ্তর বা কার্যালয়, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, এমনকি ছোট-বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এখন থেকে আয়কর আইনের আওতায় ‘নির্দিষ্ট ব্যক্তি’ (Specified Person) হিসেবে গণ্য করা হবে। এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জারীকৃত এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো করের আওতা সম্প্রসারণ করা এবং প্রতিটি লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
আইনি ভিত্তি ও বাধ্যবাধকতা নতুন আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৩৪২ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এবং একই আইনের ১৪০(৩) ধারার বিধান সাপেক্ষে এনবিআর এ আদেশটি জারি করেছে। এর ফলে এখন থেকে আইনের অধীনে ঘোষিত 'নির্দিষ্ট ব্যক্তি' বা প্রতিষ্ঠানগুলো যখনই কোনো তৃতীয় পক্ষকে (ব্যক্তি, ঠিকাদার, সেবা প্রদানকারী বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান) যেকোনো ধরনের নির্ধারিত বিল, চার্জ বা অর্থ পরিশোধ করবে, তখনই তাদের বিল থেকে আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে নির্ধারিত আয়কর কেটে রেখে বাকি অর্থ প্রদান করতে হবে।
শুধু কর কর্তন করাই শেষ কথা নয়; কর্তনকৃত সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, কোন খাত থেকে কত টাকা কর কর্তন করা হলো এবং কখন তা কোষাগারে জমা দেওয়া হলো—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও নথিপত্র যথাযথ নিয়ম মেনে সংরক্ষণের কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। হিসাব সংরক্ষণে কোনো শিথিলতা বা অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার ইঙ্গিতও রয়েছে।
কেন এই উদ্যোগ এবং কতটা প্রভাব ফেলবে? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে উৎসে কর কাটার পরিধি বহুগুণে বিস্তৃত হবে। এতদিন যেসব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে কর কর্তনের বিষয়ে অস্পষ্টতায় ছিল কিংবা আওতার বাইরে ছিল, তারাও এখন সরাসরি এই জবাবদিহির অধীনে আসবে।
এনবিআরের রাজস্ব নীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আয়করের বড় একটি অংশ আসে উৎসে কর থেকে। এই প্রক্রিয়াটি যত বেশি বিস্তৃত ও ডিজিটাল তদারকির আওতায় আসবে, আয়কর আদায় তত বৃদ্ধি পাবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সেবা প্রদানকারী বা বিল গ্রহণকারীরা পরবর্তীতে নিজ থেকে কর দেবেন কি না—সেই অনিশ্চয়তা দূর হবে। লেনদেনের শুরুতেই কর কেটে রাখার কারণে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং সরকারের রাজস্ব আহরণের গতি ত্বরান্বিত হবে।
এই পরিপত্রের ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং ও হিসাবরক্ষণ বিভাগে নিয়োজিতদের এখন থেকে প্রতিটি বিল চূড়ান্ত করার আগে উৎসে কর কর্তনের বিষ্যে সতর্ক থাকতে হবে, যা সার্বিক অর্থনীতিতে একটি সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল কর সংস্কৃতি তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



