ছবি: সংগৃহীত
দেশের বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ব্যাপকভিত্তিক অনুসন্ধান শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং সরকারি অর্থের যথাযথ হিসাব নিশ্চিত করতে এই বৃহৎ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সিআইসি-র নজরদারি ও তথ্য তলব
এনবিআরের বিশেষায়িত তদন্ত শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ইতোমধ্যে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও অধিদপ্তরের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। বিশেষ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), বাংলাদেশ রেলওয়ে, নৌপরিবহন, পানিসম্পদ এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্পগুলোর তথ্য চাওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে সওজের প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়েছে সিআইসি। ওই চিঠিতে উন্নয়ন প্রকল্পের নাম, প্রকল্পের ধরন, অর্থায়নের উৎস (সরকারি, বৈদেশিক বা অন্যান্য), ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, প্রতিষ্ঠানের বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন), ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন), প্রকল্পের মোট বাজেট এবং কাজ শুরুর তারিখসহ মোট ৮টি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে তথ্য চাওয়া হয়েছে। সিআইসির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রকিবের নির্দেশনায় এই চিঠি পাঠানোর পর সওজ তাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে এসব তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান
সিআইসি সূত্র জানায়, গোপন সূত্রে তাদের কাছে খবর এসেছে যে বেশ কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় মেগা প্রকল্প ও স্থানীয় উন্নয়ন অবকাঠামো থেকে মোটা অঙ্কের বিল নিলেও তার বিপরীতে নির্ধারিত হারে আয়কর ও ভ্যাট পরিশোধ করছে না। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই প্রকল্প ও ঠিকাদারভিত্তিক তথ্য মেলানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৮২ অনুযায়ী সিআইসি এই আইনি সহযোগিতা চেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে ঠিকাদারের আয় ও পরিশোধিত করের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা হবে।
টিআইবি-র প্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা
এনবিআরের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তবে তিনি মনে করেন, এই পদক্ষেপ আরও অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, ঠিকাদারদের কর ফাঁকি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গেলে দেশের তলানিতে থাকা কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে তা সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন—যদি তদন্তে উঠে আসে যে এসব রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে এনবিআরের নিজস্ব অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে, তবে সংস্থাটি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে কতটা সচেষ্ট হবে? এটিই এখন দেখার বিষয়।
উন্নয়ন বাজেট ও বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা
রাজস্ব ফাঁকি ঠেকানোর এই তৎপরতা এমন এক সময়ে শুরু হলো যখন সরকার অবকাঠামো খাতে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে।
-
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা।
-
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এডিপির আকার আরও বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।
-
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাজেট প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মোট জাতীয় বাজেটের ৩৩.৭০ শতাংশই ব্যয় হবে উন্নয়ন খাতে, যা গত অর্থবছরে ছিল ২৭.২৭ শতাংশ।
বিশাল এই ব্যয়ের বিপরীতে রাজস্ব সংগ্রহের চাপও এনবিআরের ওপর অনেক বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এনবিআর ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা আদায় করতে পারলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল ৮১,৪৪২ কোটি টাকা (১৮.৪২%)। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরকেই এককভাবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে।
উৎসে কর ও রাজস্বের প্রভাব
এনবিআরের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংস্থাটির সংগৃহীত মোট আয়করের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে উৎসে ও অগ্রিম কর থেকে। এর মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ সংগৃহীত হয় ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের সময় কেটে রাখা উৎসে কর থেকে।
সরকারি উন্নয়ন খাতের বিপুল ব্যাপ্তি বিবেচনায় ঠিকাদারি খাতের সম্পূর্ণ রাজস্ব প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় আনতে পারলে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



