ছবি: সংগৃহীত
দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ক্যাশলেস লেনদেনে উৎসাহিত করতে সর্বজনীন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’-এর মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা লেনদেন ফি কমানো কিংবা সম্পূর্ণ বাতিলের চিন্তাভাবনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত ফি সংক্রান্ত আপত্তির কারণে মাঠপর্যায়ে বাংলা কিউআরের ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সার্বিক খরচ কমানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘ভর্তুকি তহবিল’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে মার্চেন্টদের সেবা মাশুলের ব্যয় মেটানো হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে খরচের বোঝা কীভাবে কমানো যায় তা নিয়ে নিবিড় পর্যালোচনা চলছে। তিনি বলেন, “সরাসরি মার্চেন্ট ফি বাতিল না করে বিকল্প অন্য কোনো উপায়ে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ কমানো সম্ভব কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।” তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে পুরোপুরি আগ্রহী করে তুলতে শেষ পর্যন্ত এই ফি হয়তো সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হতে পারে। এ সংক্রান্ত সার্বিক দিকনির্দেশনা ও ভর্তুকি বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার বিস্তারিত উল্লেখ করে খুব শিগগিরই একটি সার্কুলার জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গেও প্রয়োজনীয় আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলা কিউআরের প্রসার ঘটলে দেশে নগদ অর্থের (ক্যাশ) লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং সার্বিক অর্থনীতি ডিজিটাল ট্রানজাকশনের আওতায় আসবে। এর ফলে সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে পাওয়া সহজ হবে, যা দেশের বিপুলসংখ্যক সম্ভাবনাময় নতুন নতুন উদ্যোক্তাকে সরাসরি করজালে বা রাজস্ব কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ তৈরি করবে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দিয়ে এই ব্যবস্থা চালু করতে সরকারের নীতিগত খরচ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্যাশলেস অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও করের আওতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারের মূল রাজস্ব আয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
ক্ষুদ্র ও অতি-ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এই ডিজিটাল বিপ্লবে অন্তর্ভুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ১০০ কোটি টাকার এই বিশেষ ভর্তুকি তহবিল গঠনের প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়েছে। ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই বরাদ্দকৃত তহবিল থেকে মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন লেনদেনের মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা সার্ভিস চার্জ বাবদ কেটে নেওয়া অর্থ ভর্তুকি হিসেবে পরিশোধ করা হবে। তবে ঠিক কোন ক্যাটাগরির বা কোন সীমার ব্যবসায়ীরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন এবং সরকারি ভর্তুকি বণ্টনের পদ্ধতি ঠিক কেমন হবে, তা চূড়ান্ত করতে বর্তমানে একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, নীতিমালার আলোকেও যদি ভবিষ্যতে ক্যাশলেস লেনদেনের পরিধি ব্যাপক হারে বাড়ে, তবে প্রয়োজনবোধে এই শতকোটি টাকার ভর্তুকি তহবিলের আকার আরও বড় করা হবে।
বর্তমান পেমেন্ট অবকাঠামো অনুযায়ী, বাংলা কিউআরে লেনদেনের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ হারে এমডিআর বা মার্চেন্ট ফি ধার্য করা রয়েছে। সহজ কথায়, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে ১ হাজার টাকার কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি করে গ্রাহকের কাছ থেকে ডিজিটালি মূল্য গ্রহণ করেন, তবে তাঁকে নির্দিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে ১০ টাকা ফি হিসেবে পরিশোধ করতে হয়। কম লাভে ব্যবসা করা প্রান্তিক বিক্রেতাদের জন্য এই ১ শতাংশ মাশুল একটি বড় আর্থিক বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছিল।
বাংলা কিউআর প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে মূলত দুটি পক্ষ মূল ভূমিকা পালন করে—অ্যাকুয়ারার এবং ইস্যুয়ার। যে ব্যাংক, এমএফএস বা ফিনটেক প্রতিষ্ঠান কোনো মার্চেন্টকে কিউআর কোড প্রস্তুত করে দেয় ও সার্বিক সেবা প্রদান করে, তাকে বলা হয় 'অ্যাকুয়ারার'। অন্যদিকে, গ্রাহক যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ওয়ালেট (এমএফএস) বা কার্ডের অ্যাপ ব্যবহার করে কিউআর স্ক্যান করে টাকা পাঠান, সেই প্রতিষ্ঠানটিকে বলা হয় 'ইস্যুয়ার'। অনেক ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ফিনটেক প্রতিষ্ঠান একই সাথে অ্যাকুয়ারার ও ইস্যুয়ার উভয় ভূমিকাই পালন করতে পারে।
বিদ্যমান নিয়মে মার্চেন্টের কাছ থেকে সংগৃহীত ১ শতাংশ এমডিআর-এর সিংহভাগ অংশই চলে যায় মূল অর্থ প্রদানকারী পেমেন্ট অ্যাপ বা ইস্যুয়ারের পকেটে। নিয়ম অনুযায়ী ১ শতাংশের মধ্যে শূন্য দশমিক ৭ (০.৭) শতাংশ অর্থ ‘ইন্টারচেঞ্জ রিইমবার্সমেন্ট ফি’ (আইআরএফ) হিসেবে অ্যাকুয়ারার প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে ইস্যুয়ার প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দিতে হয়। আর অবশিষ্ট শূন্য দশমিক ৩ (০.৩) শতাংশ অর্থ বাংলা কিউআর সরবরাহকারী অ্যাকুয়ারারের আয় বা পরিচালনা ব্যয় হিসেবে জমা থাকে। অথচ প্রতিটি মার্চেন্টের জন্য একটি স্বতন্ত্র বাংলা কিউআর কোড তৈরি, ছাপানো এবং তা দোকানে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর এককালীন প্রায় ৯০ থেকে ১০০ টাকা খরচ হয়।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে দেখা যায়, এশিয়ায় ডিজিটাল পেমেন্টে দ্রুততম প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বাংলা কিউআরের ১ শতাংশ ফি অত্যন্ত বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ‘ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস’ (ইউপিআই) ব্যবস্থার মাধ্যমে কিউআর ব্যবহারে মার্চেন্টদের কোনো প্রকার ফি-ই দিতে হয় না, যা ভারতের চা-দোকানি থেকে শুরু করে বড় শপিংমলে ক্যাশলেস লেনদেনকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। একইভাবে নেপালেও 'ফোনপে' (Fonepay) ও 'নেপালকিউআর' (NepalQR) ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের ওপর কোনো ফি চাপানো হয় না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় তাদের জাতীয় কিউআর ব্যবস্থা ‘কিওআরআইএস’ (QRIS)-এ মার্চেন্ট ফি মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বখ্যাত ডিজিটাল পেমেন্ট হাব চীনে ‘আলিপে’ (Alipay) ও ‘উইচ্যাট’ (WeChat)-এর ক্ষেত্রে এই হার মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।
ফলে এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, লেনদেন ফি শূন্য বা একেবারে ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ে ক্যাশলেস অর্থনীতির বিস্তার সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ফি কমানো বা মওকুফের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বাংলা কিউআর ব্যবহারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশে কাঙ্ক্ষিত ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনে অত্যন্ত ইতিবাচক ও দূরদর্শী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



