ছবি: সংগৃহীত
ব্যবসার ধরন অনুযায়ী সহজ ও একক করহার নির্ধারণ করে পাঁচ বছর মেয়াদি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স চালুর একটি যুগান্তকারী সুপারিশ এসেছে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত ‘প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট পলিসি কো-অর্ডিনেশন কমিটি’র (পিএসডিপিসিসি) গুরুত্বপূর্ণ এক সভায় সভাপতির বক্তব্যে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। তিনি মনে করেন, পাঁচ বছরের জন্য এককালীন ডিজিটাল লাইসেন্স প্রদান করা হলে উদ্যোক্তাদের বার্ষিক নবায়নের ভোগান্তি দূর হবে এবং দেশে বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ আরও সুসংহত হবে। একই সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাস পরপর পিএসডিপিসিসি-র ফলোআপ সভা আয়োজনেরও জোর পরামর্শ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের সভায় সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সভার মূল আলোচনার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প। আলোচনার সূচনায় মুখ্য সচিব স্পষ্ট জানান, নীতিগত বা প্রশাসনিক সুবিধার জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কোনো ফাইল বা বিষয় উপস্থাপনের আগে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক খসড়া, গবেষণা ও নিখুঁত তথ্য-বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পণ্যের গুণগত মান ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) সার্টিফিকেশন-সংক্রান্ত সব ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বাধা অবিলম্বে দূর করতে হবে।
সবুজ জ্বালানির প্রসারে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সৌরশক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির উদাহরণ টেনে মুখ্য সচিব বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শুল্কমুক্ত সুবিধায় সৌর যন্ত্রাংশ আমদানির যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের তা ব্যবহারে এগিয়ে আসতে হবে এবং তাদের উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি দেশের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে সাশ্রয়ী পরিবর্তন আনতে জাতীয় রেলখাতে বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়েও তিনি বিশেষ পর্যালোচনার তাগিদ দেন।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা সংস্থা ‘বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট’-এর (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম। তিনি দেশের বর্তমান ব্যবসা পরিবেশের জটিল চিত্র তুলে ধরে জানান, বাংলাদেশে একটি উৎপাদনমুখী শিল্প বা ব্যবসা চালু করতে একজন উদ্যোক্তাকে অন্তত ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া ১৫৪টির মতো প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি ও জমা দিতে হয় এবং এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৪৫৭ দিন সময় লেগে যায়। তদুপরি, ১০টিরও বেশি সংস্থায় বারবার একই ধরনের বাড়তি নথিপত্র জমা দেওয়ার ঝক্কি পোহাতে হয়, যা ব্যবসার গতিকে মারাত্মকভাবে শ্লথ করে দেয়।
এই চরম ভোগান্তি ও সময়ক্ষেপণ রোধে ফেরদৌস আরা বেগম একটি যুগান্তকারী বিকল্প প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইআরসি (ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) ও ইআরসি (এক্সপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব। তাঁর মতে, আইআরসি ও ইআরসি বিলুপ্ত করলে সরকারের সামান্য পরিমাণে রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে, কিন্তু প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার কারণে দেশের সামগ্রিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত বিপুলভাবে লাভবান হবে।
কমিটির বৈঠকে নীতিগত সুপারিশের বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানান, পাবলিক-প্রাইভেট ডায়ালগ (পিপিডি) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিল্ড যেসব দূরদর্শী সুপারিশ তৈরি করে, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ কিন্তু দিনশেষে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও দপ্তরগুলোর সদিচ্ছা ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান এ বিষয়ে যোগ করে বলেন, বিল্ডের প্রতিটি সুপারিশ মনগড়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক সেরা চর্চা এবং দেশীয় ব্যবসার ক্ষেত্রের বাস্তব প্রতিবন্ধকতাগুলো গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা করেই তৈরি করা হয়। এসব ভালো ও যৌক্তিক সুপারিশগুলো যদি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন শীর্ষ কমিটিতে পাঠানো যায়, তবে প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নের গতি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
সভায় দেশীয় চামড়া শিল্পের ক্রান্তিকাল ও বর্তমান সংকট নিয়ে বিষদ আলোচনা হয়। এফবিসিসিআই-এর মহাসচিব মো. আলমগীর বলেন, তৈরি পোশাক খাতের তুলনায় চামড়া খাতের বিশ্ববাজার অর্জন না করার পেছনে সাভার চামড়া শিল্প নগরীর অকার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। এই অকার্যকর ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার ট্রেসেবিলিটি বা উৎস সনাক্তকরণ এবং রপ্তানি পারফর্ম্যান্স মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান এ বিষয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত প্রস্তুতি কিংবা উপযুক্ত প্রযুক্তি নিশ্চিত না করেই তড়িঘড়ি করে চামড়া শিল্পনগরী হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছিল, যার খেসারত এখন শিল্প মালিকদের দিতে হচ্ছে।
শিল্প খাতের এই ত্রুটি স্বীকার করে নিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান জানান, সাভার সিইটিপির নকশাগত যে গলদ ছিল তা তারা চিহ্নিত করেছেন। বর্তমানে একজন ইতালীয় বিশেষজ্ঞ পরামর্শক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ বিষয়টি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বিশ্ববাজারে চামড়া রপ্তানির জন্য 'লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ' (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেশন অর্জন বাধ্যতামূলক। আর এই সার্টিফিকেশন পেতে হলে কারখানার পূর্ণ কমপ্লায়েন্স অর্জন করতেই হবে, যার জন্য বড় ধরনের আর্থিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
চামড়া শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহিমা খানম তাঁর মতামত তুলে ধরেন। তিনি জানান, শিল্পনগরীর বর্জ্যকে মূলত দুটি অংশে ভাগ করা যায়—এক অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান এবং অপর অংশ মারাত্মক ক্ষতিকর স্লাজ। তিনি বলেন, পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্রোম বা ক্রোমিয়াম। এই ক্ষতিকর ক্রোম আলাদা করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই পরিবেশ দূষণ না করে চামড়া বর্জ্যকে কিভাবে বাণিজ্যিকভাবে পুনরায় ব্যবহার করা যায়, সেই ধরনের উদ্ভাবনী মডেল নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অবকাঠামো ও বাণিজ্য পরিবেশ সুসংহত করতে সেতু বিভাগের সচিব আব্দুর রউফ সাভার সিইটিপি রক্ষণাবেক্ষণে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স কঠোরভাবে মানার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে আসন্ন কোরবানি মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণের জন্য দেশজুড়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার তাগিদ দেন।
ব্যবসা পরিচালনার অন্যান্য করসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব আশ্বস্ত করে বলেন, ব্যবসায়ীদের থেকে যে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কেটে নেওয়া হয়, তা চূড়ান্ত আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় নিখুঁতভাবে সমন্বয় করা সম্ভব এবং প্রয়োজনে রিফান্ড বা ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এনবিআর ইতোমধ্যে ট্যাক্স রিফান্ড বা কর ফেরতের পুরো প্রক্রিয়াটিকে ম্যানুয়াল থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার কাজ দ্রুত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ীদের অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং হয়রানি বন্ধ হবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



