ছবি: সংগৃহীত
আর্থিক খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানকে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় এনে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। অকার্যকর ঘোষণা করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড। রোববার (৯ আগস্ট) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করে সেগুলোকে অকার্যকর ঘোষণা করে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে। বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি, উচ্চমাত্রার শ্রেণিকৃত ঋণ ও বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় তারল্য বজায় রাখতে ব্যর্থতা, আয়ক্ষমতার অবনতি এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে অক্ষমতা—এসব কারণকে এ সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি রেজল্যুশন কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রশাসক ও সহ-প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন, সার্বিক ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করবেন।
প্রশাসক ও সহযোগী প্রশাসকের দায়িত্ব পেলেন যারা
আভিভা ফাইন্যান্সে অস্থায়ী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-১১-এর পরিচালক মো. আলাউদ্দীন হোসেন। এ প্রতিষ্ঠানে সহযোগী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম গোলাম বহুলুল ও মো. মাহবুবুর রহমান। অন্যদিকে, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-২-এর পরিচালক আবু সামা মো. আতাউর রহমান; তার সঙ্গে সহযোগী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অতিরিক্ত পরিচালক রোকসানা আক্তার ও মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বসির।
একইভাবে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-১০-এর পরিচালক মো. সাদেকুর রহমান। এই প্রতিষ্ঠানে সহযোগী প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক সাদরিল আহমেদ ও মো. আল-আমিন। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে প্রশাসক করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির পরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে। তাঁর সহযোগী প্রশাসক হিসেবে কাজ করবেন অতিরিক্ত পরিচালক ফরিদ উদ্দীন আহমেদ ও জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এ পদক্ষেপের মাধ্যমে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আমানতকারী ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণে কার্যকর অগ্রগতি হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই আইন অনুযায়ী এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ফারইস্ট ফাইন্যান্সে এ হার ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সে ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এর আগে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং মূলধন ঘাটতিকে ভিত্তি ধরে গত বছর ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘অপরিচালনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অকার্যকর ঘোষণা করা চারটি প্রতিষ্ঠানের বাহিরে বাকি পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো :- পিপলস লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সংকটে থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের এবং বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের।
বর্তমানে দেশে ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি—অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হার ৮৩.১৬ শতাংশ। বিপরীতে ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ১৫টি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭ শতাংশ; ২০২৪ সালে তারা ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে এবং মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা খাতটির মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭২ শতাংশ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



