ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং ও উন্নত ইলেকট্রনিক্সের বাড়তি চাহিদার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দ্রুত সম্প্রসারণের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এশিয়ার দেশগুলো বৈশ্বিক চিপ সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে প্রতিযোগিতায় নামার প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাত এখন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নীতিমালা ঘোষণার ওপর নয়, বরং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি কর প্রণোদনা ঘোষণা, গত জুনে অনুষ্ঠিত ‘সিলিকন রিভার ইউএসএ রোডশো’ এবং দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক্স, এআই অ্যান্ড রোবোটিক্স (বিইএআর) সামিট ২০২৬’-এর পর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখন বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ বৈশ্বিক নজর কাড়ার চেয়ে বেশি—একটি বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীরের মতে, আগামী দুই বছরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর খাতে নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হয়ে উঠতে পারবে কি না। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু নীতিমালার ঘোষণা নয়, বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চাইবেন—যেমন ২০০ থেকে ৩০০ প্রকৌশলী নিয়ে সক্রিয় ডিজাইন সেন্টার চালু, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ‘অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং, মার্কিং অ্যান্ড প্যাকেজিং’ (এটিএমপি) সুবিধা নিশ্চিত করা, দ্রুত নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।
বিশ্ববাজারে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এই খাতের বাড়তি গুরুত্ব ও জরুরিতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে। ওয়ার্ল্ড সেমিকন্ডাক্টর ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকস (ডব্লিউএসটিএস)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এআই অবকাঠামো, হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি ও উন্নত কম্পিউটিংয়ের চাহিদায় ভর করে ২০২৬ সালে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১ দশমিক ৫১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এদিকে, ভারত ইতোমধ্যে তাদের সেমিকন্ডাক্টর কর্মসূচিতে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর ভিয়েতনাম ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন প্রকৌশলী গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই পরিস্থিতির তুলনায় বাংলাদেশের লক্ষ্য কিছুটা পরিমিত। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি বর্তমানের প্রায় ৮০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই লক্ষ্য অর্জন নতুন প্রণোদনা দেওয়ার চেয়ে দেশ কত দ্রুত দক্ষ জনশক্তি, গবেষণা সক্ষমতা এবং টেস্টিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর বেশি নির্ভর করবে।
নীতিমালা সমর্থন থেকে শিল্প সম্প্রসারণ
সেমিকন্ডাক্টর খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকার ডিজাইন সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) টুলস, টেস্টিং সরঞ্জাম ও উন্নত প্যাকেজিং যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক, ভ্যাট ও কর ছাড়ের সুবিধা ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা তৈরি করছে। সিলিকোনোভা-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী সিরাজুল আলম খান বলেন, বাজেট ঘোষণা, ‘সিলিকন রিভার ইউএসএ রোডশো’ এবং ‘বিইএআর সামিট’ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তার মতে, এসব উদ্যোগের ফলে আউটসোর্সিং প্রকল্প, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির সঙ্গে প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে একই সাথে তিনি মনে করেন, ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি ডেডিকেটেড বা বিশেষায়িত সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা তহবিল, ইডিএ টুলস ও সেমিকন্ডাক্টর ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি (আইপি)-তে সহজ প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি-ভিত্তিক অর্থায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের জোরদার উদ্যোগ প্রয়োজন; যা কোম্পানিগুলোকে উন্নত প্রযুক্তি বাণিজ্যিকীকরণ এবং সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও টেস্টিং খাতে সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।
দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বড় চ্যালেঞ্জ
নীতিগত সহায়তা বাড়লেও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রধান বাধা এখনো দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার ইইই এবং ২৬ হাজার কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট বের হলেও তাদের বেশিরভাগকে শিল্পের উপযোগী করে তুলতে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বিডার জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্সের সদস্য ড. এ বি এম হারুন-উর-রশিদের মতে, অধিকাংশ গ্র্যাজুয়েটকে প্রায় এক বছর মেয়াদি ‘ভেরি লার্জ স্কেল ইন্টিগ্রেশন’ (ভিএলএসআই) প্রশিক্ষণ নিতে হয়। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, দেশে জটিল সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্প পরিচালনায় অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর সংখ্যাও এখনো অত্যন্ত সীমিত।
ড. হারুন বলেন, ‘এই শিল্পের জন্য ১০ থেকে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রকৌশলী প্রয়োজন, যা দল পরিচালনা করতে এবং জটিল প্রকল্পগুলো সফল করতে পারবেন। অভিজ্ঞতার এই ঘাটতি রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়।’ তিনি সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প খাতের সমন্বয়ে একটি টেকসই মেধা উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এর মধ্যে ডেডিকেটেড ভিএলএসআই প্রোগ্রাম, শিল্পের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম, বাণিজ্যিক ইডিএ টুলসের সহজলভ্যতা, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগ এবং ভিএলএসআই ডিজাইনের জন্য একটি ‘জাতীয় সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ প্রতিষ্ঠা করা অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
পরবর্তী মাইলফলক: টেস্টিং এবং প্যাকেজিং
সিলিকোনোভা, উল্কাসেমি, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর ও প্রাইম সিলিকন টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনে একটি ভিত্তি তৈরি করলেও, খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ও প্যাকেজিং সক্ষমতা গড়ে তোলা। আলমাস কবীরের মতে, এ জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং, মার্কিং অ্যান্ড প্যাকেজিং’ (এটিএমপি) সুবিধা স্থাপন, বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ বা সিঙ্গেল-উইন্ডো নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা চালু এবং অন্তত দুটি বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির সঙ্গে বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি দক্ষ সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা জোরদার এবং টেস্টিং ও প্যাকেজিং অবকাঠামো সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
ড. হারুন ‘আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্টিং’ (ওএসএটি) এবং উন্নত প্যাকেজিংকে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর যাত্রার স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, দেশের উচিত ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০টি ভিএলএসআই ডিজাইন কোম্পানি, ৩টি সেমিকন্ডাক্টর টেস্টিং সুবিধা এবং ২টি প্যাকেজিং শিল্প প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নেওয়া, পাশাপাশি অন্তত একটি গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিকে বাংলাদেশে ডিজাইন সেন্টার স্থাপনে আকৃষ্ট করা।
একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা
বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ)-এর সভাপতি এম এ জব্বারের মতে, ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রণোদনার মেয়াদ বাড়ানো বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিতে গুরুত্বপূর্ণ আস্থা তৈরি করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে মেধা উন্নয়ন, যৌথ বা শেয়ারড ডিজাইন অবকাঠামো গড়ে তোলা, উন্নত টেস্টিং ও প্যাকেজিং সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণায় অর্থায়ন, শক্তিশালী মেধাস্বত্ব (আইপি) সুরক্ষা এবং শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা নিশ্চিত করাকে তিনি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এম এ জব্বার ও সিরাজুল আলম উভয়েই মনে করেন, সেমিকন্ডাক্টর খাতের বাণিজ্যিকীকরণ ত্বরান্বিত ও বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি ‘জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল’, স্টার্টআপ সহায়তা কর্মসূচি, প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থায়ন, শেয়ারড ডিজাইন অবকাঠামো এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রক অনুমোদন চালু করা জরুরি। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ‘সিলিকন রিভার ইউএসএ রোডশো’, ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং ‘বিইএআর সামিট ২০২৬’ বৈশ্বিক কোম্পানি, বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী পেশাজীবীদের মধ্যে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়িয়েছে, ফলে গবেষণা সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বিদেশি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, এই আগ্রহকে কাজে লাগাতে এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের সক্ষমতা মূল্যায়ন করবেন দক্ষ প্রকৌশলীর প্রাপ্যতা, আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ও প্যাকেজিং সুবিধা, গবেষণা সক্ষমতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক পরিবেশের ভিত্তিতে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



