ছবি: সংগৃহীত
সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে সরকার গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে দেশের সব ধরনের সরকারি রাজস্ব, ফি, কর, চার্জ, সেবা মূল্য এবং অন্যান্য সরকারি প্রাপ্তি জমার ক্ষেত্রে ‘এ-চালান’ বা স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল চালান পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত সনাতন বা ম্যানুয়াল চালান ব্যবস্থার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন থেকে কোনো সরকারি দপ্তর, সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠান এ-চালানের বাইরে অন্য কোনো পদ্ধতিতে সরকারি অর্থ গ্রহণ বা জমা দিতে পারবে না।
অর্থ বিভাগের জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, সংযুক্ত দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারের অধীনস্থ অন্যান্য অফিসে সরকারি রাজস্ব ও প্রাপ্তি সংগ্রহের একমাত্র মাধ্যম হবে এ-চালান। কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি এখনো পুরোনো বা বিকল্প কোনো অর্থ গ্রহণ ব্যবস্থা চালু থাকে, তবে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে জমা থাকা সরকারি অর্থ ৩০ জুনের মধ্যে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট (টিএসএ)-এ স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের মতে, সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি অর্থ দ্রুত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ ও সাশ্রয়ী করা, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে সরকারি অর্থ অপ্রয়োজনীয়ভাবে পড়ে থাকা কমানো এবং রাজস্ব সংগ্রহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ভুয়া চালান, জালিয়াতি, হিসাবের অসঙ্গতি এবং অর্থ জমা সংক্রান্ত অনিয়ম দূর করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে কার্যকর হলো, যখন এ-চালান প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং লেনদেনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ-চালান ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৪ লাখ ৭ হাজার ২২৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এ-চালানের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সময়ে এ-চালান প্ল্যাটফর্মে মোট ৬ কোটি ৭৫ লাখ চালান প্রক্রিয়াকরণ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে সরকারি রাজস্ব সংগ্রহে ডিজিটাল ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি এ-চালান ব্যবহার করছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বর্তমানে যে প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব জমা হচ্ছে, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত সীমিত পরিসরে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র ১৭টি চালান দিয়ে এ-চালান কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে এটি সম্প্রসারণ করা হয়। গত সাত অর্থবছরে এই প্ল্যাটফর্মে মোট ১৯ কোটি ৩ লাখেরও বেশি চালান প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে এবং সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ১০ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এ-চালান সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
শুধু মোট লেনদেনই নয়, অনলাইন মাধ্যমে রাজস্ব জমার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনলাইন চালানের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ কোটি ৩৬ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে অনলাইনের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৯৮ কোটি ১২ লাখ টাকায়।
অন্যদিকে ব্যাংক শাখার কাউন্টার বা ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) লেনদেনের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। একই অর্থবছরে ওটিসি পদ্ধতিতে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়লেও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক কাউন্টার ব্যবহার করেও এ-চালানের মাধ্যমে সরকারি অর্থ জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
একসময় সরকারি ফি, লাইসেন্স ফি, বিভিন্ন সেবা মূল্য, কর বা অন্যান্য সরকারি রাজস্ব জমা দিতে নাগরিকদের নির্দিষ্ট ব্যাংক শাখায় গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। চালান পূরণ, অর্থ জমা, রসিদ সংগ্রহ এবং পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তা জমা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সময়সাপেক্ষ ও জটিল। অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য, ভুয়া চালান, হিসাবের অসঙ্গতি এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ পৌঁছাতে বিলম্বের মতো সমস্যাও দেখা দিত। এর ফলে নাগরিক ভোগান্তির পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজেও বিলম্ব হতো।
এ-চালান চালুর মাধ্যমে এসব সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর হয়েছে। এখন সরকারি অর্থ জমা দিতে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংক শাখায় যেতে হয় না। দেশের যেকোনো স্থান থেকে, যেকোনো সময় ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরকারি ফি ও রাজস্ব পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থ জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল চালান রসিদ তৈরি হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে ডাউনলোড, সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা যায়। ফলে নাগরিকদের সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের শাখা কাউন্টার, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড এবং বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় ও ট্যাপের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে সহজেই সরকারি রাজস্ব, ফি এবং অন্যান্য অর্থ জমা দেওয়া যাচ্ছে। এর ফলে নাগরিকদের জন্য সরকারি অর্থ পরিশোধের সুযোগ আরও সহজ, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ-চালান পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের নগদ অর্থের অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। এতে সরকারের নগদ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে সরকারি অর্থ অলস অবস্থায় পড়ে থাকার প্রবণতা কমে আসবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ দ্রুত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়ায় অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
এ ব্যবস্থায় অর্থ জমা হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদান-প্রদান ও সমন্বয় হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো ক্রেডিট স্ক্রল সরাসরি আইবাস++ (iBAS++)-এ আপলোড হওয়ায় হিসাব মিলানোর কাজ আগের তুলনায় অনেক দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। এতে সময় বাঁচছে, মানবিক ভুল কমছে এবং আর্থিক হিসাবের নির্ভুলতা বাড়ছে।
এছাড়া এ-চালান ড্যাশবোর্ড এবং অনলাইন যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে যেকোনো চালানের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে জাল চালান তৈরি, ভুয়া রসিদ ব্যবহার, রাজস্ব ফাঁকি এবং অন্যান্য আর্থিক অনিয়ম প্রতিরোধে এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারের মতে, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক, গতিশীল এবং জবাবদিহিমূলক করে তুলবে। একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব সংগ্রহে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিক সেবার মানও আরও উন্নত হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



