ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি খাতে স্বস্তির খবর এনে, চলতি জুলাই মাসের জন্য তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম কমিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বুধবার (২ জুলাই) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই মূল্য হ্রাসের ঘোষণা দেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন এ দর একই দিন সন্ধ্যা থেকেই দেশব্যাপী কার্যকর হয়েছে।
সর্বাধিক ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম পূর্বের ১ হাজার ৪০৩ টাকা থেকে ৩৯ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৬৪ টাকা। ভোক্তা পর্যায়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলে মনে করা হচ্ছে, বিশেষত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য, যাদের রান্নার জন্য এই ধরনের গ্যাসের উপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি।
এছাড়াও, বিভিন্ন ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দামও নির্ধারণ করেছে বিইআরসি, যা হলো—
৫.৫ কেজি: ৬২৫ টাকা
১২.৫ কেজি: ১,৪২১ টাকা
১৫ কেজি: ১,৭০৫ টাকা
১৬ কেজি: ১,৮১৮ টাকা
১৮ কেজি: ২,০৪৬ টাকা
২০ কেজি: ২,২৭৩ টাকা
২২ কেজি: ২,৫০০ টাকা
৩০ কেজি: ৩,৪০৯ টাকা
৩৩ কেজি: ৩,৭৫০ টাকা
৩৫ কেজি: ৩,৯৭৭ টাকা
৪৫ কেজি: ৫,১১৪ টাকা
এই নতুন মূল্য সাধারণ ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতেও খরচ হ্রাসে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলপিজির পাশাপাশি কমানো হয়েছে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও। প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ১ টাকা ৮৪ পয়সা হ্রাস পেয়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৬২ টাকা ৪৬ পয়সা। জুন মাসে এ দাম ছিল ৬৪ টাকা ৩০ পয়সা।
প্রসঙ্গত, অটোগ্যাস হলো সেই গ্যাস, যা সিএনজির বিকল্প হিসেবে তরল রূপে যানবাহনে ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে ছোট যাত্রীবাহী যানবাহনগুলোর মধ্যে এলপিজিভিত্তিক অটোগ্যাসের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিইআরসি মোট ১১ বার এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম পুনর্নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে সাত বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং চার বার কমানো হয়েছে।
দাম বাড়ানো হয়— জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে।
দাম কমানো হয়— এপ্রিল, মে, জুন ও নভেম্বর মাসে।
ডিসেম্বর মাসে এলপিজির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
সর্বশেষ ২ জুন অটোগ্যাসের দাম সমন্বয় করেছিল বিইআরসি। ওই সময় প্রতি লিটারে ১ টাকা ২৭ পয়সা কমিয়ে ৬৪ টাকা ৩০ পয়সা করা হয়েছিল।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকো কর্তৃক নির্ধারিত CP (Contract Price) রেটের ভিত্তিতে বাংলাদেশের এলপিজি ও অটোগ্যাসের মূল্য হালনাগাদ করা হয়। চলতি জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কিছুটা কমেছে, যার প্রভাব এবার ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের জনগণকে সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি সরবরাহ করতে। এতে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হবে, তেমনি সার্বিক মূল্যস্ফীতিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।”
দাম হ্রাসের খবরে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, এই পরিবর্তন আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। গৃহিণী নাজমা আক্তার বলেন, “সিলিন্ডার কিনতে মাসে প্রায় দেড় হাজার টাকা চলে যায়। এখন যদি একটু কমে, তাহলে কিছুটা হলেও সাশ্রয় হবে।”
অন্যদিকে, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল্য হ্রাস হলে বিক্রিও কিছুটা বাড়ে, কিন্তু কমিশনের হার অপরিবর্তিত থাকায় তাদের লাভের পরিমাণ কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি ও জ্বালানি তেলের দাম আরও কমলে দেশীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়বে। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধ ও সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত হলে দাম আবারও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি খাতে সরকারের এই সাম্প্রতিক মূল্য হ্রাসের পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর কিছুটা হলেও স্বস্তি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তারা আরও স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নীতির ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে মাসে মাসে দামের ওঠানামার ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি না হয়।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



