ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন এনবিআরের সদস্য (কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) আহসান হাবিব। একই সঙ্গে তাকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৯ জুন) সন্ধ্যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজস্ব প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এনবিআরের চেয়ারম্যান পদে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ কর কর্মকর্তা আহসান হাবিবকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশাসন, কর কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
বিশেষ করে এ নিয়োগকে ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। কারণ, প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম আয়কর ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেলেন। দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমস ও ট্যাক্স—দুই ক্যাডারের মধ্যে নেতৃত্বের ভারসাম্য নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, এই নিয়োগের মাধ্যমে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এনবিআরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি নয়; বরং দক্ষতা, সততা, পেশাদারিত্ব এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি।
নিয়োগের খবর প্রকাশের পর এনবিআরের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আহসান হাবিব দীর্ঘদিন ধরে একজন সৎ, নীতিবান, কর্মঠ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি কখনো আপস করেননি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি বিসিএস (ট্যাক্সেশন) অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। কর প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি একজন দায়িত্বশীল, সহজ-সরল ও পেশাদার প্রশাসক হিসেবে পরিচিত।
আহসান হাবিবের কর্মজীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দায়িত্ব পালন। ২০২৫ সালে সরকার এনবিআর পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়ে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠনের লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সেই সময় দাবি-দাওয়ার আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভ্রান্ত করে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ ওঠে।
সেই সংকটময় সময়ে আহসান হাবিব অত্যন্ত ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। তিনি আলোচনার মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, তার বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং দূরদর্শিতার কারণে বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। ফলে এনবিআরের কার্যক্রমও স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয় প্রশাসন।
এর আগে কর অঞ্চল-১৫-এর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আহসান হাবিব আলোচিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে তদন্ত শুরু করার ক্ষেত্রে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দেন এবং আইনের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যান।
পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)-এর মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় দেশের শীর্ষ ১০টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার নেতৃত্বে কর গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও গতিশীল হয় এবং কর ফাঁকি রোধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা থেকেও কর আদায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম ‘উল্কাগেমস’ থেকে বিপুল পরিমাণ বকেয়া কর আদায়ে তার নেতৃত্বে নেওয়া পদক্ষেপ ব্যাপক আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও তার নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি কর নিরীক্ষা, কর মূল্যায়ন, ট্রান্সফার প্রাইসিং, গোয়েন্দা তদন্ত, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল ট্যাক্স প্রশাসন, ই-ফাইলিং এবং ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এনবিআরের ডিজিটাল রূপান্তরের বিভিন্ন উদ্যোগেও তিনি সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাজস্ব আদায় সহজ করা, করদাতাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে তোলার বিষয়ে তার আগ্রহ দীর্ঘদিনের।
পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তিনি দেশ-বিদেশে অসংখ্য প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছেন। কর প্রশাসন, তদন্ত, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থা, ডিজিটাল ট্যাক্সেশন এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বিষয়ে ভারত, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন এবং ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। এছাড়া সরকারি সফর ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন। এসব অভিজ্ঞতা দেশের কর প্রশাসনে আধুনিক চিন্তা ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে তাকে সহায়তা করেছে।
তিনি কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেই নয়, একজন প্রশিক্ষক ও জ্ঞানবিনিময়কারী হিসেবেও পরিচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন, বিসিএস (কর) একাডেমি, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত রিসোর্স পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কর প্রশাসন, ডিজিটাল সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সুশাসন বিষয়ে তার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সেশন সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
শিক্ষাজীবনেও আহসান হাবিব ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৫তম বিসিএস (কর) ক্যাডারের জাতীয় মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। প্রশিক্ষণকালেও তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। বিসিএস (কর) একাডেমির বিভাগীয় প্রশিক্ষণে প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার প্রশিক্ষণে এ-প্লাস এবং বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) ফাউন্ডেশন কোর্সেও এ-প্লাস অর্জন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সফল ও সুশৃঙ্খল একজন মানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৯৬৯ সালে ঝালকাঠি জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বিবাহিত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। তার ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)-তে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। অন্যদিকে তার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন করছেন।
উল্লেখ্য, এনবিআরের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। বিদায়ী চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে—এমন গুঞ্জনও ছিল। পাশাপাশি এনবিআরের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সদস্যের নামও সম্ভাব্য চেয়ারম্যান হিসেবে আলোচনায় আসে। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্তে আহসান হাবিবকেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কর প্রশাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সৎ ভাবমূর্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা, ডিজিটাল রূপান্তরে নেতৃত্ব এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতার কারণেই তাকে এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন তার নেতৃত্বে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং করদাতাবান্ধব সেবা সম্প্রসারণে নতুন গতি আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



