ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা: কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দা (যার পরিচিতি নম্বর ৩০০১২০)। তিনি ২২তম বিসিএস কাস্টমস ও ভ্যাট ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। আওয়ামী সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৯ আসামির মধ্যে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে মামলার রায় ঘোষণা করেন। তার মেয়ে কাজী নিশাত রসুল। নিশাত রসুল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১ ছিলেন। এই নিশাত রসুলের মাধ্যমে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ এই কাস্টমস ও ভ্যাট ক্যাডার কর্মকর্তা মিয়া মো. আবু ওবায়দা সব পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, এই কর্মকর্তা তার অফিস বাদ দিয়ে নিশাত রসুলের বাসায় পড়ে থাকতেন।
এবার আসি তার দুর্নীতির ফিরিস্তি বলতে—এই আবু ওবায়দা প্রথম চাকরি শুরু করেন ২০০৩ সালে এবং প্রথম পোস্টিং পান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে। এরপর বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করলেও চাকরির প্রায় ৭০ শতাংশ সময় তিনি শুধু বন্ডেই কাজ করেছেন। কেননা, তিনি সহকারী কমিশনার (এসি) হিসেবে বন্ডে কাজ করেছেন, আবার উপ-কমিশনার (ডিসি) হয়ে বন্ড থেকে বিদায় নেন। এরপর আবার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) হিসেবে অবিভক্ত ঢাকা কাস্টম বন্ড কমিশনারেটে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে ঢাকা বন্ড কমিশনারেট দুটি ভাগে বিভক্ত হলে তিনি পদায়ন নিয়ে ঢাকা উত্তর বন্ডে যান। শুধু তাই নয়, যখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) দায়িত্ব পান, তখনও তিনি বন্ড বিভাগেই কাজ করেছেন। পুরো কর্মজীবনজুড়ে শুধু বন্ড আর বন্ড। এছাড়া মাঝে মাঝে মোংলা কাস্টম হাউস, ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট, আইসিডি কাস্টম হাউস ও ঢাকা উত্তর ভ্যাটে কাজ করেছেন। এমনকি নজিবুর রহমানের সঙ্গে সিআইসি-তে কাজ করেও বেশ অর্থ কামিয়েছেন।
একবার চিন্তা করে দেখুন, এই কর্মকর্তা তার ২৩ বছরের কর্মজীবনের প্রায় ৭০ শতাংশ সময় কাটিয়ে দিয়েছেন কেবল বন্ডেই! তার সহকর্মীরাই তাকে ‘বন্ড হুজুর’ বলে ডাকেন। কারণ, দাড়ি রেখে তিনি ঘুষের রামরাজত্ব কায়েম করে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আর এসব টাকা ঘুষ হিসেবে নেন মাদ্রাসার নাম করে। তিনি নিজে কয়েকটি মাদ্রাসা গড়ে তুলেছেন এবং বন্ডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সেসব মাদ্রাসায় ‘হাদিয়া’ দিতে বাধ্য করেন। এসব কোটি কোটি টাকার হাদিয়া আদায় করার জন্য তার একটি বিশ্বস্ত দলও রয়েছে।
এই চক্রে যুক্ত কর্মকর্তারা হলেন—উত্তর বন্ডের হেডকোয়ার্টার্সের দায়িত্বে থাকা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আখতারুজ্জামান স্মরণ, চৌধুরী গোলাম হাসনাইন এবং তাকনিম হাসান। এরা প্রতি মাসে মাদ্রাসার নামে কমিশনার ওবায়দার শতকোটি টাকার ঘুষের অর্থ সংগ্রহ করে ওবায়দার বাসায় পৌঁছে দেন। এর সুবাদে এই কর্মকর্তারাও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তারা এখন বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন এবং ঢাকা ও গ্রামে বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেছেন। ব্যাংকে রয়েছে কোটি টাকার ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর। এমনকি সন্তান, স্ত্রী, ভাই-বোন ও শ্বশুর-শাশুড়ির নামেও অগাধ সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এমনই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে আরও জানা গেছে, এই কর্মকর্তা কাস্টমস ও ভ্যাটের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন চরিত্র, যিনি বন্ড ছাড়া অন্য কোথাও বদলি হতে চান না—যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ইতিহাসে বিরল।
এদিকে, ২২তম বিসিএসের এই বিতর্কিত কর্মকর্তা তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি করেছেন। ১ সেপ্টেম্বর এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা উত্তরে পদায়ন করা হয়। অথচ এর আগের দিন, ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তাকে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট থেকে মোংলা কাস্টম হাউসে পদায়ন করা হয়েছিল। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে এমন নজিরবিহীন বদলির ঘটনা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আগে কখনো ঘটেনি। পুরো এনবিআর জুড়ে বিষয়টি নিয়ে হইচই পড়ে গেছে। তার সহকর্মীদের মতে, বর্তমান বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে তিনি আবারও রাজধানীতেই পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে পুরো রাজস্ব বিভাগে আলোচনার ঝড় তুলেছেন এই কর্মকর্তা। আগে আওয়ামী লীগের প্রভাব ব্যবহার করে টাকা কামিয়েছেন, আর এখন বিএনপি ও এনবিআর কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটিপতি হচ্ছেন।
অন্যদিকে, ২০২০ সালে এই কর্মকর্তাকে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য ‘সার্টিফিকেট অব মেরিট’ পুরস্কার দেওয়া হয়। শতকোটি টাকার মালিককে কেন এই পুরস্কার দেওয়া হলো, তা নিয়েও তখন তুমুল বিতর্ক হয়। শোনা যায়, তৎকালীন প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই ওবায়দা এই পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছিলেন।
এছাড়া ওবায়দা কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে প্রতি মাসে ২ কোটি টাকা ঘুষ নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘ফরিদ’ নামের এক ব্যক্তি এবং ‘জামান এক্সেসরিজ’-এর মালিক জামানের মাধ্যমে এই ঘুষ নেওয়া হতো। প্রতি মাসে তাকে নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা দিত এসিএস টেক্সটাইল, এনজেড গ্রুপ, নিট কনসার্ন গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ ও নিউ এশিয়া গ্রুপ।
আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বন্ড কমিশনারেট ভবনের নিচতলায় অবস্থিত একটি সাধারণ ফটোকপির দোকান। বাইরে থেকে সাধারণ দোকান মনে হলেও মূলত এটি একটি জাল নথিপত্র তৈরির কারখানা। এই দোকানের কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন ব্যবহার করে জাল ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) এবং ভুয়া বন্ড সংক্রান্ত নথিপত্র তৈরি করা হয়। এই ভুয়া নথির ওপর ভর করে মাহমুদ গ্রুপ ও ডংবেং গ্রুপসহ একাধিক শিল্পগোষ্ঠীর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইমরান হাসান নিজে উপস্থিত থেকে ওই দোকানের জালিয়াতি করা নথিপত্র সত্যায়ন করতেন।
অন্যদিকে, তার মেয়াদে যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারের হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—মাহমুদ ইন্ডিগো লিমিটেড, মাহমুদ ওয়াশিং প্ল্যান্ট লিমিটেড, মাহমুদ ডেনিম লিমিটেড, মাহমুদ জিন্স লিমিটেড এবং মাহমুদ ফ্যাব্রিক্স অ্যান্ড ফিনিশিং লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের ইউপি থেকে শুরু করে বন্ডের যাবতীয় দলিলাদি জাল।
বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় দেশে আনা কাঁচামালের বিরাট অংশ বাস্তবে কারখানায় ব্যবহার না হয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে খোলাবাজারে এসব পণ্য বিক্রির ফলে সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। শুধু তার বন্ডে থাকার সময়েই উত্তর বন্ড থেকে সরকার অন্তত ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে। এসবের সঙ্গে শুধু ওবায়দা একা নন, কাস্টমসের উল্লিখিত রাজস্ব ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারাও সরাসরি জড়িত। কারণ, তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া ওবায়দা একাই এই বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি করতে পারতেন না। অবশ্য ওবায়দাও বিনিময়ে তাদেরকে কোটিপতি বানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে হেডকোয়ার্টার্সের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান স্মরণ বলেন, “নিউজ করবেন কি করবেন না, সেটা আপনার সুবিবেচনার বিষয়।”
তবে এ বিষয়ে কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, এই কর্মকর্তার বিষয়ে কাস্টমস ও ভ্যাটের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমিশনার আবু ওবায়দা গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজধানী ঢাকাতেই অবস্থান করছেন। যেখানে অন্যান্য কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলি হতে হয়, সেখানে এই কর্মকর্তা এক অদৃশ্য ক্ষমতার বলে ঢাকায় লোভনীয় সব পোস্টিং বাগিয়ে নেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “গত সরকার দুর্নীতির লাগাম টানতে পারেনি। এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি রোধ করা। সরকারি যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত। সেজন্য দুদককে আরও শক্তিশালী হতে হবে। এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রচুর। এগুলো ঘটে কারণ দুদক বা এনবিআর ঠিকমতো তদারকি করে না। আমি মনে করি, এখন এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। দুর্নীতি প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, “এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠা বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া নতুন কিছু নয়। এটি বহু পুরনো বিষয়। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, যারা এটি মনিটরিং করার দায়িত্বে আছেন, তারা ঠিকমতো নজরদারি করেন না। ঠিকমতো তদারকি করা হলে কেউ দুর্নীতি করার সাহস পেত না। এখানে এনবিআর, দুদক এবং সরকার—সব পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতি করলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।”
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



