ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১২ বছর পর দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাঙ্ক্ষিত জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন এই ‘জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬’ অনুমোদনের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত দাবির পূরণ হলেও, সার্বিক অর্থনীতি ও দেশের বিশাল বেসরকারি খাতের জনগোষ্ঠীর ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে প্রবল আশঙ্কা ও সংশয় তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে সরকারি খাতে এই বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা মারাত্মকভাবে বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর নেতিবাচক চাপ এসে পড়বে সাধারণ ও বেসরকারি খাতের মানুষের ওপর।
গত সোমবার আয়োজিত মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন বেতন স্কেলটি চলতি বছরের ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকেই কার্যকর হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর হুট করে বড় ধরনের চাপ এড়াতে বর্ধিত এই মূল বেতন চাকরিজীবীরা একবারে হাতে পাবেন না; এটি ধাপে ধাপে মোট তিনটি পর্যায়ে কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে, চিকিৎসা, বাড়িভাড়াসহ সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ধরণের ভাতাগুলো একযোগে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পুরোপুরি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নতুন এই বেতন কাঠামোতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে এমন সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা বিশেষ ভাতা প্রদান, সর্বস্তরের সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা সুবিধা চালুকরণ এবং অবসরপ্রাপ্তদের সুবিধার কথা চিন্তা করে পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির মতো বেশকিছু নতুন কল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত স্থান পেয়েছে।
পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন এই বেতন কাঠামোতেও সর্বমোট ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। তবে সর্বনিম্নের ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন পূর্বের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে একলাফে ১৪২ শতাংশের মতো বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অপরদিকে, সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্তরে বেতনের এই ব্যপক বৃদ্ধি নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিশ্লেষণ মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যার সাথে যোগ হয়েছে সরকারের রাজস্ব আহরণে মারাত্মক দুর্বলতা। অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধির এমন নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেও চাকরিজীবীদের জন্য বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা সরকারের জন্য বিশাল এক আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাজারে বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান বাড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় সরকারের রাজস্ব উদ্বৃত্ত না থাকায় শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে। ফলে দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কাটছাঁট করা অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। আর সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে এবং পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাতের কোটি কোটি মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন করে আর্থিক চাপের মুখে পড়বে।
নতুন এই বিশাল অঙ্কের বেতন কাঠামো ঘোষণার সাথে সাথেই দেশের সাধারণ বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা চরম মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও স্বীকার করেছেন যে, সরকার নিম্ন ও উচ্চ গ্রেডের ব্যবধান কমিয়ে বৈষম্য কমানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে বটে, তবে ঢালাওভাবে বেতন বৃদ্ধির ফলে দেশে 'কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি' থেকেই যাচ্ছে।
সার্বিক বিতর্কের জবাবে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পর পর নতুন পে-স্কেল আসার কথা থাকলেও বিগত ১২ বছর ধরে তা থমকে ছিল। এসব বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের ব্যবধান বিবেচনা করে একটি সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো উপহার দেওয়ার জন্য সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। তবে এই নতুন বেতন কাঠামোর অর্থ জোগাড় করতে সরকার কোন পথে হেঁটে রাজস্ব সুসংহত করবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



