ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনি কৌশল ও আসন বণ্টন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠক এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে—ফ্যাসিস্টবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বিএনপি প্রাথমিকভাবে ৫০টি আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যের ভিত্তিতে ২০ থেকে ২৫টি পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে, যদিও বিএনপি নিজে অন্তত ৭০ শতাংশ আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার কৌশল নিয়েই মাঠে নামতে চায়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন লন্ডনে অবস্থান করলেও, প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা থেকে শুরু করে আসন বণ্টনের আলোচনায় তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি ইতোমধ্যে দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন এবং সারাদেশে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা তৈরির চূড়ান্ত কাজ হাতে নিয়েছেন। সূত্র জানায়, এ তালিকায় অর্ধেকেরও বেশি আসনের প্রার্থী নির্ধারণ হয়ে গেছে।
প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিএনপি এবার বেশ কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড স্থির করেছে। ত্যাগী, অভিজ্ঞ, জনপ্রিয় এবং ক্লিন ইমেজসম্পন্ন নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বিতর্কিত, দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত কিংবা জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে নতুন ও পরিচ্ছন্ন নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই বললেই চলে। যদিও অতীতে ২০-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ছিল জামায়াত, তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম খোলাখুলিভাবে বলেছেন, জামায়াত এখনো শত্রু নয়, কিন্তু দলটির কিছু বক্তব্য বিব্রতকর। তিনি মনে করেন, প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতির দাবি তুলে বিএনপিকে নির্বাচনে ঠেকানোর কৌশল নিয়েছে জামায়াত। এ কারণে বিএনপি এখন তাদের সঙ্গে সরাসরি কোনো সমঝোতায় যেতে রাজি নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিএনপির সঙ্গে কৌশলগত ঐক্যের চেষ্টা করছে। বিএনপির ভেতরে এ বিষয়েও আলোচনা চলছে। যদিও দলটির নীতিনির্ধারকরা প্রকাশ্যে এখনো কিছু বলেননি, তবে পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এনসিপি ও তাদের মিত্র গণঅধিকার পরিষদকে আসন ছাড়ের আওতায় আনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে গত দুই বছরে যে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে বিএনপির পাশাপাশি গণতন্ত্র মঞ্চ, এলডিপি, ১২-দলীয় জোট, সমমনা জোট, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, গণফোরাম, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন বামপন্থি, ডানপন্থি ও ইসলামি দল সক্রিয় ভূমিকা রাখে। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন—এই দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনে সমঝোতা বা আসন সমন্বয় হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
বিএনপির আরেক নীতিনির্ধারক সালাহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো মূল্যে নির্বাচন চায় বিএনপি। এজন্য বিভিন্ন দলের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। তবে আপাতত নতুন কোনো স্থায়ী জোট গঠনের চিন্তা নেই, বরং আসনভিত্তিক সমঝোতা এবং নির্বাচনের পর জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিও একই সুরে বলেছেন—রাজনীতিতে শেষ কথা নেই। নির্বাচনের আগে জোট হবে কিনা, নাকি আসন সমঝোতা হবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে জনগণের রায় পেলে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে যাঁরা একসঙ্গে ছিলেন, তাঁদের নিয়েই জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করবেন তারেক রহমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির এই আসন ছাড়ের কৌশল তাদের অতীত অভিজ্ঞতার ফসল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের আসন সমন্বয় অত্যন্ত সফল হয়েছিল। আবার ২০১৮ সালে জামায়াতের প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপির ভোট কাটার অভিযোগের মুখে পড়ে। এবার বিএনপি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—জোট নয়, সমঝোতা; জামায়াত নয়, সমমনা শরিকদের অগ্রাধিকার।
এছাড়া বিএনপির তরুণ প্রজন্মভিত্তিক দলগুলোর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এর মাধ্যমে দলটি তাদের ভোটভিত্তি তরুণ সমাজের কাছে আরও প্রসারিত করতে চাইছে।
সবমিলিয়ে বলা যায়, বিএনপি এবারের নির্বাচনে একক প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দিয়ে সীমিত আসন ছাড়ার নীতি নিয়েছে। তবে কৌশলগত স্বার্থে সমমনা দলগুলোকে পাশে টেনে নেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে নতুন মিত্রদের নিয়ে নির্বাচনের পথে হাঁটতে চাচ্ছে তারা। শেষ পর্যন্ত এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনি মাঠে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



