ছবি: সংগৃহীত
রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কার্যক্রমকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ৩৮ বছর পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আইনটি সংশোধনের পথে। টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩-এর আধুনিকীকরণ এবং রাজউকের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে প্রস্তাবিত রাজউক অধ্যাদেশ-২০২৫ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অধ্যাদেশটি অনুমোদন পেলে নগর উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে।
১৯৫৩ সালে গৃহীত টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার পরিকল্পনা ও উন্নয়নের নীতিমালা স্থির করা হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) গঠন করা হয়। ট্রাস্ট কাঠামোতে স্বায়ত্তশাসন বেশি থাকায় কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে ভাল ছিল। তবে ১৯৮৭ সালে আইন পরিবর্তন করে রাজউক গঠন করা হলে প্রতিষ্ঠানটি আমলাতন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনায় কাঙ্ক্ষিত প্রভাব সেভাবে দেখা যায়নি।
রাজউকের আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। এর মধ্যে বিভিন্ন বিভাগের মতামত নিয়ে ২০১৯ সালে খসড়া প্রস্তুত হয়। পরে ২০২০ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারের পরিবর্তন এবং পদক্ষেপের স্থবিরতার কারণে ৩৮ বছর পর এই আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে আসছে।
১. পরিচালনা পর্ষদ সম্প্রসারণ:
বর্তমান ৫ সদস্যের বোর্ডের পরিবর্তে ১০ সদস্যের নতুন বোর্ড গঠন করা হবে। এর মধ্যে ৫ জন সার্বক্ষণিক এবং ৫ জন খণ্ডকালীন সদস্য থাকবেন। বোর্ডে পেশাজীবী ও জনপ্রতিনিধিদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
২. শাস্তির বিধান শক্তিশালীকরণ:
-
মাস্টার প্ল্যান অমান্য করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড। অপরাধ অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা জরিমানা।
-
নিরাপত্তাবেষ্টনী, খুঁটি বা পোস্ট সরালে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ৫ কোটি টাকা জরিমানা।
-
অবৈধ দেয়াল বা স্থাপনা নির্মাণ করলে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের জেল। কুঁড়েঘরের জন্য সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের জেল।
-
সড়ক দখল বা সরকারি অনুমোদন ছাড়া ভূমি ভরাট করলে ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ কোটি টাকা জরিমানা।
-
অপরাধ অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অর্থদণ্ড ধার্য থাকবে, যা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
৩. উন্নয়নস্বত্ব বিনিময়:
সরকারি কোনো উন্নয়নকাজের ফলে ভূমির মূল্য বৃদ্ধি হলে রাজউক সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করবে, যা অর্থ বা ভূমি উন্নয়নের অংশ হতে পারে।
৪. নগর পুনঃউন্নয়ন ও পুনর্বিন্যাস:
ঝুঁকিপূর্ণ, জরাজীর্ণ ও অপ্রতুল এলাকায় জীবনমান ও কাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বসবাসযোগ্য করে তোলা হবে। একাধিক খণ্ডিত জমি একীভূত করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ, রাস্তা, ড্রেন, পার্ক ও গণপরিসর অক্ষুণ্ণ রাখা নিশ্চিত করা হবে।
স্থপতি ইকবাল হাবিব ও অন্যান্য পেশাজীবীরা মনে করেন, রাজউককে আমলানির্ভরতা থেকে মুক্ত করে ট্রাস্টের মতো স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো ফিরিয়ে আনলে নগর উন্নয়নে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানও বলেন, “আমলানির্ভর বোর্ড দিয়ে রাজউক কার্যকরভাবে কাজ করছে না। তাই নতুন আইন সংশোধনের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন এবং জনসেবার মান বৃদ্ধি জরুরি।”
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান, অধ্যাদেশ-২৫-এর চূড়ান্ত প্রস্তাবনায় কিছু নতুন ভেটিং ও পেশাজীবীদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিগগিরই সংশোধিত অধ্যাদেশ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অধ্যাদেশটি অনুমোদন পেলে নগর উন্নয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নাগরিক সেবার মানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাবে। পাশাপাশি রাজউকের ভেতর ও বাইরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হবে। বিশেষ করে মাস্টার প্ল্যান অমান্য, অবৈধ নির্মাণ ও সড়ক দখলের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে।
প্রায় ৪ দশক পর প্রস্তাবিত এই আইন সংশোধন রাজধানীর নগর উন্নয়ন ও সেবার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। নগরীর চেহারা, নিরাপত্তা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে সুসংগত ও স্বচ্ছ নীতি কার্যকর হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



