ছবি: সংগৃহীত
ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস এক নাটকীয় ঘটনায় দলীয় নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কংগ্রেস সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি লিখে রাহুল গান্ধীর জন্য বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত মালায়ালম ভাষার এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচারিত একটি সরাসরি বিতর্ক অনুষ্ঠান থেকে। সেখানে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির মুখপাত্র প্রিন্টু মহাদেব এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “রাহুল গান্ধীকে বুকে গুলি করা হবে।” প্রকাশ্যে জাতীয় নেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের হত্যার হুমকি কেবল ভারতীয় রাজনীতিতে অভূতপূর্ব নয়, বরং সমগ্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রবিবার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে. সি. ভেনুগোপাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে লেখা চিঠিতে বিষয়টিকে “ঠাণ্ডা মাথায়, পরিকল্পিত ও ভীতিকর হুমকি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এটি কোনো অসাবধানতাবশত উচ্চারিত উক্তি নয় কিংবা রাজনৈতিক বিতর্কে হঠাৎ আবেগের বশবর্তী হয়ে বলা মন্তব্যও নয়। বরং এটি সুস্পষ্টভাবে বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের অন্যতম শীর্ষ রাজনীতিকের বিরুদ্ধে সংগঠিত হত্যার হুমকি।
ভেনুগোপাল সতর্ক করে দেন—যদি সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত, কঠোর এবং প্রকাশ্য পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে তা সহিংসতার বৈধতা ও স্বাভাবিকীকরণের মতো ভয়াবহ বার্তা দেবে। তার মতে, এমন অবস্থান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গের সামিল।
চিঠিতে কংগ্রেস আরও উল্লেখ করেছে, রাহুল গান্ধীর নিরাপত্তা নিয়ে অতীতে সিআরপিএফ একাধিক সতর্কবার্তা জারি করেছে। তারা জানিয়েছে, তার ওপর হামলার আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকে সিআরপিএফের পাঠানো এমনই এক সতর্কবার্তা সম্প্রতি রহস্যজনকভাবে সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। এই ফাঁস হওয়ার ঘটনায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডের সন্দেহ প্রকাশ করেছে কংগ্রেস।
ভেনুগোপাল তার চিঠিতে স্পষ্ট করে বলেন, “অবিশ্বাস্যভাবে এই সতর্কবার্তার কপি ফাঁস হয়ে যাওয়াটা কেবল নিরাপত্তার শর্ত লঙ্ঘনই নয়, বরং এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে গান্ধী পরিবার বারবার সন্ত্রাস ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিজ দেহরক্ষীরা হত্যা করে। ১৯৯১ সালে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরাম্বুদুরে নির্বাচনি প্রচারণার সময় আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। এই পারিবারিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে রাহুল গান্ধীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বহুদিনের।
কংগ্রেসের দাবি, ইন্দিরা ও রাজীবের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য বাস্তব হুমকিতে রূপ নিতে পারে। তাই রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দেওয়া হত্যার হুমকি হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।
প্রিন্টু মহাদেবের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের পাশাপাশি অনেক নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সরকারি দলের একজন অফিসিয়াল মুখপাত্রের মুখ থেকে এ ধরনের সহিংস ও উসকানিমূলক মন্তব্য আসা শুধু রাহুল গান্ধীর জীবনের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি নয়, বরং ভারতের সংবিধান, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও বিপজ্জনক নজির।
কংগ্রেস নেতাদের অভিযোগ, বিজেপি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ভাষা ব্যবহার করছে। তারা বলছে, এই হুমকি নিছক মৌখিক নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।
চিঠিতে কংগ্রেস রাজ্য পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে দ্রুত, দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন, যা দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে আসতে হবে। তারা চায়, এমন বার্তা যাক—ভারতের রাজনীতিতে সহিংসতার কোনো স্থান নেই।
ঘটনা নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কংগ্রেস নেতাকর্মীরা হ্যাশট্যাগ চালু করে রাহুল গান্ধীর নিরাপত্তার দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা বা মহাদেবের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা আসেনি। এই নীরবতা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
সবমিলিয়ে বলা যায়, রাহুল গান্ধীর প্রতি প্রকাশ্য হত্যার হুমকি ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। কংগ্রেস বলছে, এটি কেবল একজন নেতার জীবনের হুমকি নয়, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা। এখন দেশজুড়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও কেন্দ্রীয় সরকার কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, এবং বিজেপি তাদের নিজস্ব মুখপাত্রের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



