ছবি: সংগৃহীত
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট (VAT) রিটার্ন দাখিল এবং রাজস্ব পরিশোধ সংক্রান্ত নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে সরকার। চলতি বছরের জাতীয় বাজেটে ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে তিন মাস বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল এবং কর পরিশোধের যে নিয়ম চালু করা হয়েছিল, তা অবশেষে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের এখন থেকে পুনরায় পূর্বের সনাতন ও প্রচলিত নিয়ম মেনে প্রতি মাসেই নিয়মিতভাবে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হবে এবং নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধ সম্পন্ন করতে হবে।
সোমবারে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই সংক্রান্ত অর্থ আইনের সংশোধনী নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) পক্ষ থেকে দেওয়া একটি বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সরকারের এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করা হয়।
বাজেট পরিকল্পনা ও রাজস্ব ঘাটতি
চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে প্রশাসনিক কাগজের চাপ ও ঝক্কি কমানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে সরকার ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুবিধা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই ব্যবস্থার অধীনে করদাতাগণকে প্রতি তিন কর মেয়াদের (ট্যাক্স পিরিয়ড) সমাপ্তিতে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার আইনি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাসহ সব ধরনের ব্যবসায়ী যেন সহজে কর ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন।
তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের রাজস্ব আদায়ের গতিপ্রকৃতিতে বড় ধরনের শ্লথগতি লক্ষ্য করে। এনবিআর-এর ভ্যাট বিভাগের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় উঠে আসে যে, তিন মাস পর পর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থপ্রবাহ এবং সরকারি কোষাগারে ভ্যাট জমার স্বাভাবিক ছন্দ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এনবিআর-এর পরিসংখ্যান থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, পূর্ববর্তী অর্থবছরের সমসাময়িক সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুন এবং আগস্ট মাসে ভ্যাট সংগ্রহের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়।
এনবিআরের পদক্ষেপ ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত
রাজস্ব আদায়ের এই নিম্নমুখী প্রবণতা এবং সরকারি তহবিলে অর্থপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার তাগিদ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নেয়। এনবিআর-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক সুপারিশ ও আবেদন পেশ করা হয়। সেখানে স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয় যে, রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতি মাসে ভ্যাট আদায়ের কোনো বিকল্প নেই।
এনবিআরের ভ্যাট উইংয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, "ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়ার কারণে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বেশ ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। এর ফলে মাসের হিসাব মাসে মেলানো এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে উঠছিল।"
এরই পরিপ্রেক্ষিতে সোমবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র ও এনবিআরের সুপারিশ বিবেচনা করে সরকার ত্রৈমাসিক প্রথাটি বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সময়সীমা ও বাধ্যবাধকতা
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, পূর্বের শিথিল নিয়ম বাতিল করে নতুন করে যে বিধান বহাল করা হয়েছে, তাতে প্রতিটি কর মেয়াদ বা মাস শেষ হওয়ার সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যেই ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট মাস সমাপ্ত হওয়ার পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে নিবন্ধিত সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের ভ্যাট রিটার্ন দাখিল এবং প্রদেয় ভ্যাটের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
এই পরিবর্তনের ফলে নিবন্ধিত ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকে আবার নিয়মিতভাবে প্রতি মাসের বিক্রয় ও কেনাকাটার হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হবে। রাজস্ব বোর্ড মনে করছে, এই আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশে ভ্যাট আদায়ের স্বাভাবিক গতি ও রাজস্বপ্রবাহ দ্রুত পূর্বের ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



