ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দেশের অন্যতম প্রাচীন ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল। দীর্ঘদিন ধরে তারা তাদের দলীয় লোগোতে নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় প্রতীক ও লেখা ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দলটির লোগো পরিবর্তনের একটি উদ্যোগ সামনে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক বৈঠককে ঘিরে। বৈঠকের সময় তার পেছনে রাখা দলীয় পতাকা এবং দেয়ালে লাগানো নতুন লোগো গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। সেই ছবি প্রকাশের পর থেকেই আলোচনার ঝড় শুরু হয়।
প্রকাশিত নতুন লোগোতে দেখা যায়—সবুজ পতাকার মাঝে একটি কিতাব বা বইয়ের ওপর উদীয়মান সূর্য অঙ্কিত। বইয়ের ওপর দাঁড়ানো সূর্যের ওপরে রয়েছে একটি কলম, যা দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লার দণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া কিতাবের দুই প্রান্ত থেকে একটি অর্ধ পরাবৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে লোগোটিকে বৃত্তাকার রূপ দিয়েছে।
এই পরিবর্তিত লোগোতে পূর্বের মতো “আল্লাহ” শব্দ বা কোরআনের আয়াত “আকিমুদ দ্বীন” নেই। এটিই মূলত সবচেয়ে বড় সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
লোগোটি প্রকাশ্যে আসার পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই লিখছেন, জামায়াত এভাবে তাদের ধর্মীয় চেহারাকে নরম করছে, যা মূলত রাজনৈতিক কৌশল। কেউ কেউ মনে করছেন, এই পরিবর্তন পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কাছে আস্থা অর্জনের কৌশল, যাতে তারা জামায়াতকে সেক্যুলার ভাবধারার কাছাকাছি মনে করে।
অন্যদিকে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে গভীর অসন্তোষ। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জামায়াতকে মানুষ ইসলামি দল হিসেবেই চেনে। অথচ নতুন লোগোতে ‘আল্লাহ’ বা ‘আকিমুদ দ্বীন’ নেই। এতে অনেকেই বিভ্রান্ত হবে, আবার অনেক কর্মী হতাশ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের উদ্যোগ ভুল বার্তা দিতে পারে। কিছু সেক্যুলার মহলের চাপ বা মৌলবাদী ট্যাগ থেকে মুক্তির চিন্তায় যদি বৃহৎ ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর ভাবনাকে উপেক্ষা করা হয়, তবে এর ফল উল্টো হবে।”
তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সদস্য নুরুল হুদা হাবিব ফেসবুকে লিখেছেন, “পুরোনো লোগোর মধ্যে ছিল ঐতিহ্য, ভাবগাম্ভীর্য ও আদর্শের আবহ। কোটি প্রাণের স্পন্দন—কোটি চোখের প্রশান্তি ছিল সেই লোগো। নতুন লোগোর ব্যাপারে দ্বিমত ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের এক সাবেক কর্মী বলেন, “জামায়াত নানা কৌশলগত পরিবর্তন আনছে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু লোগো পরিবর্তনে তৃণমূল পর্যায়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পূর্বের লোগোটি জামায়াতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক ছিল। প্রয়োজনে নতুন লোগো আনা যেত, কিন্তু অন্তত কোরআনের আয়াত রাখা উচিত ছিল। তা না হলে আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে।”
সমালোচনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, “আমরা লোগো পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় আছি। আমিরের নির্দেশনায় বেশ কয়েকটি ডিজাইন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ভুলবশত ছবিতে চলে এসেছে। কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত লোগো প্রকাশ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “লোগো নিয়ে নির্বাহী পরিষদে আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে সেটিই অফিসিয়ালভাবে ব্যবহার করা হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের এই পদক্ষেপ দলটির ভবিষ্যৎ কৌশলের ইঙ্গিত বহন করছে। বহু বছর ধরে দলটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও সমালোচনার মুখে আছে। এ অবস্থায় হয়তো তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর প্রয়াস নিচ্ছে। তবে এ ধরনের পরিবর্তন যদি কর্মীদের ভেতরে বিভ্রান্তি ও হতাশার জন্ম দেয়, তাহলে তা তাদের সংগঠনগত কাঠামোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে জামায়াতের নতুন লোগো প্রকাশ রাজনৈতিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে এটি আধুনিক কৌশলের অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে দলীয় ভিত্তি ও ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠছে। এখন সবার দৃষ্টি জামায়াতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে—তারা কি আগের প্রতীকগুলো ধরে রাখবে, নাকি আধুনিক রূপে নতুন লোগো চূড়ান্ত করবে, সেটাই দেখার বিষয়।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



