ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিবছর দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে এ সম্পর্কের ওপর নেমে এসেছে অশনি সংকেত। বিশেষ করে পাল্টাপাল্টি অশুল্ক বাধার কারণে ব্যবসার খরচ এক লাফে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এতে শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং সাধারণ ভোক্তার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
আগে বাংলাদেশের শিল্প খাতের অনেক কাঁচামাল ও পণ্য স্থলবন্দর দিয়ে দ্রুত আমদানি করা যেত। সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলোতে খরচও ছিল তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু অশুল্ক বাধা আরোপের পর পণ্য প্রবাহে ব্যাপক ভাটা পড়েছে। এখন অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হচ্ছেন চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে, যা কেবল সময়সাপেক্ষই নয়, খরচও বাড়াচ্ছে বহুগুণ। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা খাত ক্রমেই চাপে পড়ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, অশুল্ক বাধা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করার জন্য বারবার ভারতের কাছে আবেদন জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সচিব পর্যায়ে তিনবার চিঠি দিয়েছেন, কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি। এমনকি বাণিজ্য উপদেষ্টা নিজে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রীকে আলোচনার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। তবুও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সচিব বলেন, “ভারতীয় পক্ষ কেন বৈঠকে বসতে চাইছে না, সে কারণটিও পরিষ্কার নয়। তবে বাস্তবতা হলো—অশুল্ক বাধার কারণে আমাদের ব্যবসার খরচ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।”
চীনের পর ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য ও কাঁচামাল দুই দেশের মধ্যে আদান-প্রদান হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের শিল্পকারখানা, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, আসবাবপত্র, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও ইলেকট্রনিক খাত ভারতীয় বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভারতও বাংলাদেশের বাজারকে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে দেখে।
চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে ভারত হঠাৎ করে বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের জন্য তৃতীয় দেশে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা স্থগিত করে। এতে বাংলাদেশি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে নতুন সংকটে পড়ে। এর এক সপ্তাহের মাথায় পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকা ১১টি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় মে মাসে, যখন নয়াদিল্লি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, আসবাবপত্রসহ একাধিক রপ্তানি পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এতে শুধু ব্যবসার খরচই নয়, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দুই দেশের স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে প্রতিদিন কোনো কোনো বন্দর দিয়ে গড়ে ৪০০ ট্রাক পণ্য আসা-যাওয়া করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১৫০-এ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার হাজারো শ্রমিক ও পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, অশুল্ক বাধার কারণে এখন ব্যবসা করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। যেসব পণ্য আগে সীমান্ত দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে আনা যেত, সেগুলো এখন সমুদ্রপথে আনতে হচ্ছে, ফলে খরচ ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী ইতিমধ্যেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
একজন আমদানিকারক বলেন, “এখন আমরা শুধু খরচের বোঝা বহন করছি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত সমস্যার সমাধান না করে, তবে আমাদের অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবো।”
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনই এ সমস্যার মূল কারণ। তারা বলছেন, দুই দেশের বাণিজ্য এখন এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবর্তে অবিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, রাজনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দুই প্রতিবেশী দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। অথচ অশুল্ক বাধার কারণে এখন বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে স্থবিরতা। দ্রুত এই সমস্যা সমাধান না হলে শিল্প ও অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উভয় দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই কেবল আলোচনার মাধ্যমে এ অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব। ব্যবসায়ী সমাজও চাইছে, সরকার আলোচনার টেবিলে বসুক এবং বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করুক।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



