ছবি: সংগৃহীত
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওমরাহ ফেরত বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর চার সংসদ সদস্য ও নেতারা ‘তুলকালাম কাণ্ড’ ঘটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। লাগেজ পেতে দেরি ও সঠিক সময়ে জমজমের পানি না পাওয়ার কারণে বিমানবন্দরে হট্টগোল করতে থাকেন বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে উত্যক্ত পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিমানের গ্রাউন্ড স্টাফদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের তীব্র বাকবিতণ্ডা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। পরে চারজন সংসদ সদস্য এ নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিমানের দুইজন কর্মীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে মদিনা থেকে ছেড়ে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ‘বিজি ৩৩৮’ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এই বিশেষ ফ্লাইটে ওমরাহ সম্পন্ন করে আসা সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্তত ৩৫ জন জাতীয় সংসদ সদস্য এবং দলটির একাধিক শীর্ষ স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা অবস্থান করছিলেন।
বিমান অবতরণের পর নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীরা টার্মিনালে প্রবেশ করেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। কিন্তু ইমিগ্রেশন শেষ করে ব্যাগেজ বেল্টের সামনে আসার পর থেকেই শুরু হয় বিড়ম্বনা। যাত্রীরা নিজ নিজ লাগেজ, ট্রলি এবং ওমরাহ যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত পবিত্র জমজমের পানি সংগ্রহের জন্য বেল্টের সামনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে থাকেন। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও ব্যাগেজ বেল্টে কাঙ্ক্ষিত মালামাল বা জমজমের পানি না আসায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে।
পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ। কিন্তু তার আগমনও বিক্ষুব্ধ যাত্রীদের শান্ত করতে পারেনি; বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অনাকঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতির প্রত্যক্ষদর্শী ও বিমানবন্দরে দায়িত্বরত এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্বাহী পরিচালক ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছানোর পরপরই জামায়াতে যোগ দেওয়া সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান তার ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং চড়াও হন। আক্তারুজ্জামান উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করতে থাকেন এবং তাকে লক্ষ্য করে কড়া ভাষায় অপমানজনক ও অশ্রাব্য কথা বলেন। এমনকি তিনি নির্বাহী পরিচালককে হুমকি দিয়ে বলেন যে, তাকে বিমানবন্দরের এই দায়িত্ব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বের করে দেওয়া হবে।
ভিডিও ফুটেজেও দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্যে জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালকের দিকে বারবার উত্তেজিত ভঙ্গিতে তেড়ে যাচ্ছেন এবং কঠোর কণ্ঠে চাপ সৃষ্টি করছেন।
এমন চরম মারমুখী আচরণের বিপরীতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ নিজেকে সংযত ও শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্দেশ্যে তিনি বিক্ষুব্ধ যাত্রীদের বোঝাতে থাকেন যে, ব্যাগেজ সরবরাহ এবং জমজমের পানি পৌঁছে দেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংকারী সংস্থা ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’-এর। পরে বিমানের আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেখানে হাজির হলে জামায়াতের সংসদ সদস্য ও নেতারা তাদের ওপরও চরম ক্ষোভ ঝাড়েন। কর্মকর্তারা যখন স্পষ্ট করেন যে ব্যাগেজ ও জমজমের পানি দুটোই সরাসরি বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণে, তখন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে।
পরে এই ঘটনা প্রসঙ্গে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ জানান, "বিষয়টি সবাই দেখেছেন। আমি খুবই বিব্রত। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না।"
বিমানের এমডি বরাবর ৪ এমপির লিখিত অভিযোগ
বিমানবন্দরে চরম যাত্রী হয়রানি, মালামাল ও জমজমের পানি সময়মতো বুঝিয়ে না দেওয়া এবং দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার অভিযোগ এনে চারজন সংসদ সদস্য বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বরাবর এক লিখিত অভিযোগপত্র পেশ করেন।
অভিযোগ পত্রে স্বাক্ষর করা চার সংসদ সদস্য হলেন: ১. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ (শেরপুর-১) ২. মোহাম্মদ কামাল হোসেন (ঢাকা-৫) ৩. সালাহউদ্দিন আইউবি (গাজীপুর-৪) ৪. জাহাঙ্গীর হুসাইন (খুলনা-২)
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ১ অক্টোবর সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইটটি অবতরণ করলেও দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর পর্যন্ত বেশিরভাগ উমরাহ যাত্রী তাদের ট্যাগযুক্ত লাগেজ হাতে পাননি। সাধারণ যাত্রীসহ ৩৫ জন সংসদ সদস্য দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে চরম অসহায় অবস্থায় আটকে ছিলেন। বিমান কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রদান করা হয়নি।
ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে লিখিত অভিযোগপত্রের ছবি প্রকাশ করে চরম ক্ষোভ জানান। তিনি লেখেন, "শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই ভোগান্তির শেষ কোথায়? আজ সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে অবতরণ করা বিজি৩৩৮ ফ্লাইটের সাধারণ যাত্রীদের পক্ষ হতে যাত্রী হয়রানি, মালামাল যথাযথভাবে বুঝিয়ে না পাওয়া ও কর্তব্যে অবহেলার কারণে আমরা ৪ জন জাতীয় সংসদ সদস্য বিমান কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগ দাখিল করলাম।"
হট্টগোল ও লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ তাদের প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করে। বিমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মদিনা থেকে আগত 'বিজি ৩৩৮' ফ্লাইটের যাত্রীদের জমজমের পানি পৌঁছাতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটেছে, তার পেছনে কন্টেইনার অফলোডিং ও অভ্যন্তরীণ পরিচালনগত গাফিলতি দায়ী ছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ব্যাগেজ বেল্টে সময়মতো জমজমের পানি না পৌঁছানোর পেছনে নির্দিষ্ট কর্মচারীদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা চিহ্নিত করা হয়েছে। সিভিল এভিয়েশন ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর কঠোর নির্দেশে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। চরম অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান এবং ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিমান কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের রিজার্ভ স্টক বা সংরক্ষিত নিজস্ব মজুদ থেকে ওমরাহ হাজীদের মাঝে দ্রুত জমজমের পানি বিতরণের ব্যবস্থা করে। একইসঙ্গে বিলম্বে আসা মূল কন্টেইনারটি দ্রুত শনাক্ত করে বেল্টে সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যবস্থাপনাগত ক্রুটি ও যাত্রীদের সাময়িক দুর্ভোগ এড়াতে অভ্যন্তরীণ তদারকি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



