ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরকার জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যদি পুনরায় অপরাধে জড়ায়, সঙ্গে সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের গতিবিধি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, পুলিশ সদর দপ্তর, বিজিবি, কোস্টগার্ড, এনএসআই, ডিজিএফআই ও এসবিকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হবে। উপদেষ্টা পরিষদে বলা হয়, মুজিববাদী সন্ত্রাসী কার্যক্রম যেকোনোভাবে বন্ধ করতে হবে এবং তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আনা হবে।
বৈঠকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে মসজিদ, মন্দিরসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জঙ্গিবাদবিরোধী বক্তব্য প্রচার অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ সংগঠন ও ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জামিনে মুক্ত হিযবুত তাহরীরের চিহ্নিত সদস্যদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এজন্য সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি এবং রাষ্ট্রীয় তিন গোয়েন্দা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিযবুত তাহরীরের প্রচারণা মোকাবিলায় পাল্টা কৌশল গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী বক্তাদের মাধ্যমে কোরআন-হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা প্রচার, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াজ মাহফিল ও জুমার খুতবায় নিয়মিতভাবে তথ্য প্রচার এবং অনলাইনে কাউন্টার-ন্যারেটিভ চালানো।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা ও অনুমোদিত সিকিউরিটি সার্ভিস ছাড়া অন্য কাউকে অস্ত্র অনুমোদন দেওয়া হবে না। এই বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
সভায় সারা দেশের চাঁদাবাজদের শনাক্ত করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এছাড়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ব্যবহার করে কোনো ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি যেন দেশত্যাগ না করতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) ক্যাম্প এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও গুজবের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সরকার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, নির্বাচনের সময় জামিনে থাকা সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপর কড়া নজরদারি সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে শুধু নজরদারি যথেষ্ট নয়; তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জামিনে মুক্ত অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী পুনরায় অপরাধে জড়ায়। নির্বাচনের আগে তাদের কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এছাড়া আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে, জামিন শর্ত ভঙ্গ করলে সঙ্গে সঙ্গে পুনঃগ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পুলিশের সাবেক আইজি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, সরকার নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে নজরদারি বাড়াতে পারে। জামিন মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার, কিন্তু অপরাধী প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রাশেদা রওনক খান বলেন, নির্বাচনের সময় জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো সময়োপযোগী উদ্যোগ। সন্ত্রাসীরা ভোটকেন্দ্র দখল, ভীতি সৃষ্টি বা ভোটারদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট নয়; স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা, কমিউনিটি পুলিশিং সক্রিয় করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
ড. রাশেদা রওনক মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দমনকে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। পাশাপাশি জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা ভয় না পেয়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের তথ্য সরাসরি কর্তৃপক্ষকে জানায়। সরকারের নজরদারি এভাবে কার্যকর রূপ পাবে এবং নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



