ছবি: সংগৃহীত
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই দুই মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে আগের বছরের তুলনায় ২০ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে ঘাটতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জুলাই–আগস্টে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল মোট ৬১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৪ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বাস্তবায়নের মধ্যে ৬ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আহরণে স্পষ্ট উন্নতি দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪৫ হাজার ৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা এবারের তুলনায় অনেক কম।
এনবিআরের বিশ্লেষণ বলছে, চলতি অর্থবছরের শুরুতে ভ্যাট খাত রাজস্ব সংগ্রহে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। জুলাই–আগস্টে ভ্যাট থেকে মোট ২২ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় সর্বোচ্চ। কাস্টমস খাত থেকেও উল্লেখযোগ্য অবদান পাওয়া গেছে—মোট আদায় ১৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে, আয়কর খাত থেকে রাজস্ব এসেছে ১৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনটি খাতই রাজস্ব আয়ের মূল উৎস হিসেবে কাজ করেছে, যদিও লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য তা যথেষ্ট হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত অর্থবছরের মে ও জুনে এনবিআর সংস্কার নিয়ে কর্মচারী আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছিল। সে সময় রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকারের আর্থিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের চাপ পড়ে। যদিও আন্দোলন থেমে যাওয়ার পর চলতি অর্থবছরে কিছুটা গতি ফেরার আশা ছিল, বাস্তবে প্রথম দুই মাসে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার, প্রযুক্তি ব্যবহারে ধীরগতি, এবং কর ফাঁকি বন্ধে যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা এখনো আশানুরূপ হয়নি।
রাজস্ব ঘাটতি সরকারের বাজেট বাস্তবায়নে চাপ তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। বাজেটে উন্নয়ন খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকলেও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ না পেলে সরকারের ঋণ নির্ভরতা আরও বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন অংশীদাররা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। বিশেষ করে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম হওয়ায় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আনার পথে রাজস্ব ঘাটতি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
যদিও লক্ষ্যমাত্রার ঘাটতি রয়েছে, রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। মাত্র দুই মাসে প্রায় ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সঠিক সংস্কার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন হলে বছরের বাকি সময়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব। তবে ঘাটতি পূরণের জন্য এনবিআরকে কর আহরণে আরও সক্রিয় হতে হবে এবং ভ্যাট ও আয়কর আদায়ে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি বাড়াতে হবে বলে তারা মত দিয়েছেন।
এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বছরের বাকি সময় ঘাটতি কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা। এজন্য নতুন করদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করা, কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, এবং কাস্টমসে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজস্ব আহরণে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে কর প্রশাসনকে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তাঁরা আশাবাদী, অর্থবছরের শেষ নাগাদ ঘাটতির পরিমাণ অনেকটা কমে আসবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



