ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও মনোভাব নিয়ে একটি বড়সড় জরিপ পরিচালনা করেছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনা পরামর্শক সংস্থা ইনোভিশন কনসাল্টিং। ‘জনগণের নির্বাচন ভাবনা’ শীর্ষক এই জরিপে অংশ নিয়েছেন দেশের ৬৪ জেলার ১০ হাজার ৪১৩ জন উত্তরদাতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এখন পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনী প্রবণতা নিয়ে পরিচালিত সবচেয়ে বিস্তৃত ও তথ্যভিত্তিক জরিপ, যা একদিকে মানুষের প্রত্যাশা, অন্যদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থার সূচক হিসেবে ধরা যেতে পারে।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, দেশের ৮৬.৫ শতাংশ মানুষ মনে করে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারি মাসেই নির্বাচন হওয়া উচিত। শুধু তাই নয়, জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের ৯৪.৩ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারিতে ভোট হলে তাঁরা ভোট দিতে যাবেন। এমন জোরালো সমর্থন বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৭৮.৭ শতাংশ মানুষ অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার কীভাবে দেশ পরিচালনা করছে—এমন প্রশ্নে ৩৯.৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন দেশ ভালো চলছে, আরেক ৩৯.২ শতাংশ বলেছেন মোটামুটি চলছে। তবে ১৭.২ শতাংশের মতে দেশ খারাপ চলছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উচ্চ শিক্ষিত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সরকারের প্রতি ইতিবাচক ধারণার হার কিছুটা কম হলেও সার্বিকভাবে জনগণের আস্থা বেশ প্রবল।
জরিপে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ৬৯.৯ শতাংশ উত্তরদাতা আস্থা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, সরকারের পক্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব। তবে ১৬.৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী এ বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। বাকি ১৩.৫ শতাংশ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সরকারের ওপর আস্থা কিছুটা কম পাওয়া গেছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ৭১.২ শতাংশ নিরপেক্ষ নির্বাচনের সক্ষমতায় আস্থা রাখলেও হিন্দুদের ক্ষেত্রে এ হার ৫৯.৪ শতাংশ, খ্রিস্টানদের ৫৪.৮ শতাংশ এবং বৌদ্ধদের ৬৭.৩ শতাংশ।
ভোটের দিনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে কি না—এমন প্রশ্নে ৬৮.২ শতাংশ উত্তরদাতা ইতিবাচক মত দিয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের তুলনায় প্রবীণ ভোটাররা পুলিশের প্রতি বেশি আস্থা দেখিয়েছেন।
এ ছাড়া ৭৭.৫ শতাংশ মানুষ মনে করছেন তাঁরা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন। অর্থাৎ নিরাপদ ভোটকেন্দ্র এবং স্বচ্ছ ভোটগ্রহণের ব্যাপারে জনগণের বড় অংশ আশাবাদী।
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation বা PR) পদ্ধতি চালু হওয়া উচিত কি না—এমন প্রশ্নে জনগণের বড় অংশ দ্বিধাগ্রস্ত। জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতার এ বিষয়ে কোনো ধারণাই নেই। আর যাদের ধারণা আছে তাদেরও ২২.২ শতাংশ বলেছেন, দেশে পিআর পদ্ধতি চালু হওয়া উচিত নয়। মাত্র ২১.৮ শতাংশ উত্তরদাতা এ পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে নবীন প্রজন্ম বা জেন-জি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পিআর পদ্ধতি সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে সচেতনতা ও ইতিবাচকতা বেশি দেখা গেছে।
জরিপে সামাজিক নিরাপত্তা ও অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কেও প্রশ্ন করা হয়। গত ছয় মাসে চাঁদাবাজির পরিস্থিতি কেমন হয়েছে জানতে চাইলে ৫৬.৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, দেশে চাঁদাবাজি বেড়েছে। মাত্র ২২ শতাংশ বলেছেন পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি। যেখানে সাধারণ পরিবারভিত্তিক উত্তরদাতাদের ৫৫.৫ শতাংশ মনে করেন চাঁদাবাজি বেড়েছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই হার ৬৬.৫ শতাংশ।
এই জরিপটি পরিচালনা করা হয় চলতি বছরের ২ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৯ হাজার ৩৯৮ জন ছিলেন পরিবারভিত্তিক উত্তরদাতা, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ১ হাজার ১৫ জন।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৫৪.২ শতাংশ, নারী ৪৫.৪ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ০.৪ শতাংশ। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৩৭.৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ছিলেন ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী তরুণ প্রজন্ম। ২৯ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে ছিলেন ৩৩.৪ শতাংশ, ৪৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ১৯.৮ শতাংশ এবং ষাটোর্ধ্ব ছিলেন ৯.৩ শতাংশ।
জরিপের ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘এত ভুল তথ্যের বন্যার মধ্যেও যদি জনগণ সরকারের প্রতি আস্থা রাখে, তবে এটি সরকারের জন্য বিশাল সমর্থন। ১৪ মাসের মাথায় এসে এমন ইতিবাচক ফলাফল সরকারের সাফল্যের প্রতিফলন।’
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে বারবার ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা বলছে—জরিপের ফলাফলে সেটি জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গেই মিলে গেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটি প্রমাণ করে মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা রাখছে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে বিশ্বাস করছে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের এমন বিপুল সমর্থন ইঙ্গিত করছে যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আয়োজন জনগণ প্রত্যাশা করছে এবং তারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতেও আগ্রহী। একই সঙ্গে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসকেও সামনে নিয়ে আসছে। তবে চাঁদাবাজি বেড়ে যাওয়া এবং পিআর পদ্ধতি নিয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আরও সচেতনতা তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



