ছবি: সংগৃহীত
আয়কর রিটার্ন দাখিলে দীর্ঘদিন ধরে করদাতারা নানান ধরনের হয়রানির অভিযোগ করে আসছিলেন। কর অফিসে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো, রিটার্ন জমা দেওয়া, প্রাপ্তিস্বীকার সংগ্রহ করা, সনদ নেওয়া এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জটিল জবাবদিহি—এসব কারণে অনেক করদাতাই বারবার বিড়ম্বনায় পড়তেন। এই ভোগান্তি থেকে করদাতাদের স্বস্তি দিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধীরে ধীরে রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া অনলাইনে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে চার শ্রেণির করদাতাদের জন্য ই-রিটার্ন বা অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়।
এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী এই চার শ্রেণি হলো—ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে কর্মরত সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী; দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী; ছয়টি বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সব মোবাইল টেলিকম সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এরপর থেকে ধীরে ধীরে ই-রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। করদাতাদের আগ্রহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তও ই-রিটার্ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়। এনবিআর জানায়, ২০২৪-২৫ করবর্ষে যারা তাদের সর্বাধিক সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয়কর বিবরণী অনলাইনে জমা দিয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সর্বাধিক রিটার্ন দাখিলের স্বীকৃতি হিসেবে এবার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ‘ই-রিটার্ন চ্যাম্পিয়ন’ পুরস্কার।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার তুলে দেন সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। পুরস্কার পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—সোনালী ব্যাংক পিএলসি, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেড, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি, ব্যুরো বাংলাদেশ এবং রেনেটা বাংলাদেশ।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, এসব প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের মধ্যে কর সংক্রান্ত সচেতনতা তৈরি করেছে এবং অনলাইন রিটার্ন প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে শুধু প্রতিষ্ঠানই নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সুবিধা পাচ্ছেন। রিটার্ন দাখিল এখন অনলাইনে সহজে করা যাচ্ছে, প্রাপ্তিস্বীকার ও সনদও এক ক্লিকেই পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর এনবিআরের এক বিশেষ আদেশে বলা হয়েছিল, আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ৩২৮ এর উপধারা (৪) এর ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। তখন চার শ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হলেও, ধাপে ধাপে এ প্রক্রিয়া সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
বাধ্যতামূলক তালিকায় ছয়টি বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে—ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড, ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড, বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি। এছাড়া দেশের সব মোবাইল অপারেটরের কর্মীরাও এর আওতায় আসেন।
সবশেষে, চলতি ২০২৫-২৬ করবর্ষ থেকে দেশের সব শ্রেণির ব্যক্তি করদাতার জন্যই ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন থেকে সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই আয়কর রিটার্ন দাখিল কেবল অনলাইন পদ্ধতিতেই করতে হবে। এনবিআর আশা করছে, এই প্রক্রিয়া করদাতাদের হয়রানি কমাবে, স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং কর আহরণের হারও উন্নত করবে।
এভাবে রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করে তুলতে চায় এনবিআর। আর যারা এই উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে, তাদের স্বীকৃতি জানাতেই চালু হয়েছে ‘ই-রিটার্ন চ্যাম্পিয়ন’ পুরস্কার।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



