ছবি: সংগৃহীত
আবুধাবি প্রবাসী নোয়াখালীর তাহের হোসেনের গল্পটা যেন এক টুকরো স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী। আট বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি লন্ড্রি দোকানে কাজ করেন তিনি। দুই বছর পর স্ত্রী-সন্তান আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে এক মাসের ছুটি কাটিয়ে রুটির তাগিদে ফিরছিলেন কর্মস্থলে। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আবুধাবি বিমানবন্দরে পৌঁছেই ধস নেমে আসে তাঁর জীবনে। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা জানান, তাঁর ভিসা বাতিল হয়ে গেছে—প্রবেশের অনুমতি নেই, ফিরতে হবে বাংলাদেশেই।
বিমানবন্দরের ফ্লোরে বসে পড়েন তাহের। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিবারের মুখ, ঋণের বোঝা, আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। শেষপর্যন্ত শুক্রবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ফিরে আসেন ঢাকায়।
তাহের বলেন, "আবুধাবিতে নেমে জানলাম ভিসা বাতিল। মনে হলো সব শেষ। এখন কীভাবে সংসার চলবে, ঋণ শোধ করব—কিছুই বুঝতে পারছি না।"
শুধু তাহেরের একার নয় এই বিপর্যয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে কর্মভিসা। ছুটিতে দেশে এসে অনেকে কর্মস্থলে ফেরার পথে বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারছেন—তাঁদের ভিসা নেই। কেউ কেউ আমিরাতের বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশনের সময় জানতে পারছেন ভিসা বাতিলের কথা।
উদ্বেগের বিষয় হলো, নিয়োগকর্তার প্রয়োজনীয় সব কাগজ ঠিক থাকার পরও ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটছে। ফলে নির্ধারিত ছুটির আগেই ফিরতে চাইছেন অনেকে, কিন্তু সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। এদিকে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একমুখী বিমান টিকিটের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় পৌঁছেছে—যেখানে আগে ৩০-৩৫ হাজার টাকায় মিলত।
কূটনৈতিক উদ্যোগ ও দূতাবাসের ভূমিকা
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, শুধু বাংলাদেশের নয়, পাকিস্তান, নেপালের কর্মীদেরও একই সমস্যা। তিনি বলেন, "ঠিক কী কারণে হচ্ছে, খতিয়ে দেখছি। আশা করি খুব শিগগির কারণ জানতে পারব।" রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে ফিরলে কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, এ পর্যন্ত ৩০০ প্রবাসীর আবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং আরও ১,৪০০ আবেদন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
দূতাবাস তাদের ফেসবুক পেজে জানিয়েছে, এটি কারিগরি ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণ—তা বোঝার চেষ্টা চলছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কোনো ব্যক্তি, দালাল বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করতে। ভিসাজটিলতায় সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দূতাবাসের সঙ্গেই যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা
রাস আল খাইমাহ প্রবাসী এসএম করিম স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গ্রীষ্মের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। ভিসাবাতিলের খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে জরুরি ভিত্তিতে ফিরতে চাইলেও টিকিটের উচ্চমূল্যে পারছেন না। তিনি বলেন, "কয়েকদিন আগেও যে টিকিট ৩০-৩৫ হাজারে পাওয়া যেত, এখন ৯৫ হাজার টাকা চাচ্ছে। যে টাকা নিয়ে এসেছি খরচ হয়ে গেছে।"
আগামী সপ্তাহে ছুটিতে বাংলাদেশ যাওয়ার কথা ছিল শওকত আলী মীরনের। আগেই টিকিট কেটেছেন। এখন শুনেছেন দেশে গেলে ভিসা বাতিল হতে পারে। তিনি বলেন, "একদিকে ভিসা হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে টাকার টিকিট নষ্ট হওয়ার ভয়। দুই দিন ধরে দূতাবাসে যোগাযোগ করছি, কেউ সাড়া দিচ্ছে না।"
কী ঘটছে, কেন?
২২ জুলাই থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিলের ঘটনা সামনে আসতে শুরু করে। অনলাইনে 'স্ট্যাটাস' যাচাই করে অনেকেই দেখেছেন 'ক্যানসেল'। আনুমানিক ৫ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেকে দূতাবাসে ধরনাও দিচ্ছেন।
তবে আমিরাত সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়ায় ঠিক কতজনের ভিসা বাতিল হয়েছে, তার সরকারি তথ্য নেই। কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হচ্ছে, তাও স্পষ্ট নয়। দূতাবাস থেকেও কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ প্রবাসীদের।
এমন সঙ্কটে বাংলাদেশি প্রবাসীরা এখন অপেক্ষায়—কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হয় কিনা, ফেরা সম্ভব হবে কিনা, আর অনিশ্চয়তার অন্ধকার কাটিয়ে ওঠা যায় কিনা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



