ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণহত্যা নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, শেখ হাসিনার সরকার যে ভয়াবহ ও ইতিহাস-বিধ্বংসী অপরাধ সংঘটিত করেছে, তা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালেও দেখা যায়নি। তিনি বলেন, এই অপরাধের ভয়াবহতা, নিষ্ঠুরতা এবং গণবিরোধী চরিত্র এতটাই গভীর ও সুপরিকল্পিত যে, তা আন্তর্জাতিক মানের অপরাধ বিচারেও অন্যতম নজির হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্য।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বিচার প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘জুলাই গণহত্যার বিচার: আলোচনা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনী’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। বক্তব্যে তিনি জুলাই মাসে সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ডকে 'মহা অপরাধ' হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তা বিচারের আওতায় আনতে সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন।
আসিফ নজরুল বলেন, “শেখ হাসিনা ও তার সরকার এমন জঘন্য অপরাধ করেছে, যার দৃষ্টান্ত এ দেশের ইতিহাসে কেবল বিরল নয়, অপ্রতিদ্বন্দ্বীও বটে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অপরাধের এমন অকাট্য দলিল রেখে গেছে, যার আলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার করলে কেউ তা অস্বীকার করতে পারবে না। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজের দখলে নিয়ে যে পদ্ধতিতে গণহত্যা চালিয়েছে, তা কোনো অবস্থাতেই ক্ষমাযোগ্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, “১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যা করেছিল, তার মধ্যে কিছু অপরাধ ছিল যুদ্ধাবস্থার বাস্তবতায় সংগঠিত, কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে সংঘটিত অপরাধ ছিল সম্পূর্ণভাবে পরিকল্পিত, রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দেশের মানুষকে ভয় পাইয়ে চিরকাল ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্রমূলক এক ধ্বংসাত্মক অপচেষ্টা।”
আইন উপদেষ্টা আরও জানান, বর্তমান সরকার এই অপরাধের বিচারে আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং সরকার কোনো গাফিলতি করছে না। বরং বিচারের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে, নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, “এই বিচার নিয়ে কেউ যেন কোনোদিন প্রশ্ন তুলতে না পারে, সেজন্যই আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পদ্ধতিতে কাঠামোগত বিচার নিশ্চিত করছি। আগামী প্রজন্মের সামনে আমরা এমন দৃষ্টান্ত রাখতে চাই, যেন তারা জানে—দায়মুক্তি নামের কিছু নেই, অপরাধ করলেই বিচার হবে।”
আসিফ নজরুল এ সময় আরও বলেন, “বিচার একটি জটিল প্রক্রিয়া। এটি রাতারাতি সম্পন্ন হওয়ার নয়। আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে চলমান এই প্রক্রিয়ার প্রতি সবার আস্থা থাকা উচিত। সরকার দৃশ্যমানভাবে যা যা করা দরকার, সবই করছে। এর চেয়ে বেশি আর কী দেখাতে পারি?”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে আসিফ নজরুল গভীর শ্রদ্ধা জানান জুলাই গণহত্যায় শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি এবং তাদের পরিবারের প্রতি। তিনি বলেন, “এই বিচার কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি শহীদ পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। আমরা চাই তারা অন্তরে শান্তি পায়, এবং তারা জানুক—রাষ্ট্র ও জনগণ তাদের পাশে আছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “বর্তমান সরকার হয়তো অন্যান্য খাতে কিছু ব্যর্থতা দেখাতে পারে, কিন্তু এই বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—এই সরকারের আমলেই সমস্ত অপরাধ, বিশেষ করে জুলাই মাসে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর বিচার সম্পন্ন হবে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও বিচারপতিদের সামনে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় যেখানে জুলাই গণহত্যার দৃশ্য, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, হাসপাতালের ছবি, পুলিশের বর্বরতা এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ তুলে ধরা হয়। এতে উঠে আসে কীভাবে রাজনীতির নামে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে একটি সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে।
ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্যে পরিস্কারভাবে উঠে এসেছে যে, বর্তমান সরকার এই গৃহযুদ্ধসদৃশ হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার ভাষায়, “শেখ হাসিনার সরকার ইতিহাসের ঘৃণিত অধ্যায় তৈরি করেছে। আমরা সে ইতিহাস সংশোধন করতে, শহীদদের সম্মান রক্ষা করতে, এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে এগিয়ে যাচ্ছি।”
এই বিচার প্রক্রিয়া শুধু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করবে না, বরং দেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের নবযাত্রা শুরু করবে—এমনটাই আশা করছেন দেশের জনগণ এবং বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



