ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কৌশলগত ও ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ঢাকা সফর করছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা উনো ইয়োশিমাসা। মঙ্গলবার বিকালে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন। এতে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, বাজেট সহায়তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয় গুরুত্ব পায়।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তিনটি বিষয়ে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে জাপানের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহযোগিতা, জ্বালানি খাতে সহায়তা বৃদ্ধি এবং জাপানি বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতেও জাপানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জাপানকে জানিয়েছেন, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ জ্বালানি ব্যয় এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির মধ্যে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্বল্প সুদে বাজেট সহায়তা ও নীতি সংস্কারভিত্তিক অর্থায়ন অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
জানা যায়, বৈঠকে জাপানের চলমান উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন অর্থায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। যদিও নতুন বাজেট সহায়তার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে জাপানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ জাপানের কাছে উন্নয়ন নীতিভিত্তিক বাজেট সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। সম্প্রতি জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ওডিএ (অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসট্যান্স) ঋণ কর্মসূচি চালু করেছে। এ কর্মসূচির আওতায় ৫ হাজার কোটি ইয়েনের সহায়তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ চাইছে ভবিষ্যতেও একই ধরনের নীতি সংস্কারভিত্তিক বাজেট সহায়তা অব্যাহত থাকুক, যাতে বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ কমে এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বিঘ্ন রাখা যায়।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জন্য জাপান শুধু উন্নয়ন সহযোগী নয়, একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদার। বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে জাপানের বাজেট সহায়তা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, শুধু ঋণ বা বাজেট সহায়তা নয়, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস উন্নয়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বই বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
জ্বালানি খাতে সহযোগিতা দেবে জাপান : বৈঠকে সবচেয়ে জ্বালানি খাত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাপানের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। জাপানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, এলএনজি ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।
এর আগে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে জ্বালানি খাতে সহায়তা ৩১২ মিলিয়ন থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বিষয়েও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে টোকিও। এছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, এমআরটি প্রকল্প (মেট্রোরেল) বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ চলমান বড় প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নেও জাপানকে প্রধান অংশীদার হিসাবে দেখতে চায় বাংলাদেশ।
অর্থমন্ত্রী বৈঠকে জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স এবং সরবরাহ শৃঙ্খলভিত্তিক শিল্পে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান। জাপানের পক্ষ থেকে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহযোগিতা অব্যাহত রাখারও আশ্বাস দেওয়া হয়।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে গুণগত পরিবর্তন আনতে সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর তদারকি এবং সময়োপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রধান এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী অভিজ্ঞ শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি একথা বলেন।
সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব কার্যক্রম পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ে কর্মরত অভিজ্ঞ শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন দেশের শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তিনি শিক্ষা খাতে ইতোমধ্যে কী কাজ হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছেন। বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করেছেন এবং চিহ্নিত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছেন।’
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



