ছবি: সংগৃহীত
দেশের বিমা খাতের নানাবিধ অনিয়ম, পেশাদারত্বের ঘাটতি এবং সুশাসনের অভাব নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্রাহকদের পাওনা অর্থ পরিশোধ না করা এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই খাতটি নিয়ে মারাত্মক নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। খাতটিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর ভবনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বিমা খাতের এসব ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরেন।
‘পেশাদারত্ব তৈরি হয়নি বিমা খাতে’
প্রাক-বাজেট সভায় অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও আর্থিক খাতের শীর্ষ সংগঠনের প্রতিনিধিরা এনবিআরের কাছে তাঁদের বাজেট প্রস্তাবনা জমা দেন।
আলোচনাকালে বিমা খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে আবদুর রহমান খান বলেন, "মোটর বিমা আগে আবশ্যিক ছিল, যার প্রিমিয়াম ছিল মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। কিন্তু সেই বাধ্যবাধকতাও একপর্যায়ে উঠে গেছে। এসব উঠে যাওয়ার পেছনের মূল কারণ হলো বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ন্যূনতম পেশাদারত্ব তৈরি হয়নি। খাতটি সঠিকভাবে না দাঁড়ানোর ফলে আজ ট্যাক্স প্রফেশনাল বা কর পেশাদার তৈরি হচ্ছে না।"
ব্যবসায়ী নেতাদের দাবির জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই মন্তব্য করেন, "একদিকে আপনারা বলছেন এই খাতে কোনো ব্যবসা নেই, অন্যদিকে দেখা যায় এখনও বিমা কোম্পানির একটি লাইসেন্স পাওয়ার জন্য বহু লোক সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে যায়।"
দক্ষ জনবল ও ‘অ্যাকচুয়ারি’ সংকট
বিমা খাতের কারিগরি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বজুড়ে বিমা ব্যবস্থাপনা যাদের ওপর নির্ভরশীল, সেই ‘অ্যাকচুয়ারি’ বা বিমা-গণিতবিদদের চরম অভাব রয়েছে বাংলাদেশে।
বিমা খাতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন:
-
দক্ষতার ঘাটতি: দেশে বিমা কোম্পানি পরিচালিত হলেও কোথাও পর্যাপ্ত অ্যাকচুয়ারি নেই, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিরল।
-
পড়াশোনার অভাব: বাংলাদেশে বিমা-গণিত বা অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা বা প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা একেবারেই গড়ে ওঠেনি।
-
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: তিনি উল্লেখ করেন, "বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র দুজন সনদপ্রাপ্ত অ্যাকচুয়ারি আছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের বয়স ৮৮ বছর পার হয়ে গেছে, আর অন্য তরুণ অ্যাকচুয়ারি হলেন আমার নিজের মেয়ে। এই রকম একটি বাস্তবতায় আপনারা কীভাবে বিমা খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা আশা করেন?"
গ্রাহকের পাওনা ও অবসর সুবিধা বঞ্চনার অভিযোগ
বিমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো মেয়াদ শেষে গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দেওয়া। এনবিআর চেয়ারম্যান বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, গ্রাহকরা সারা জীবন কষ্টার্জিত অর্থ থেকে প্রিমিয়াম জমা দেন, অথচ মেয়াদ পূর্তির (ম্যাচিউরিটি) পর বছরের পর বছর ঘুরেও নিজেদের প্রাপ্য অর্থ পান না।
শুধু সাধারণ গ্রাহকই নন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীরাও তাঁদের অবসরকালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তিনি জানান। নিজের প্রত্যক্ষ একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আবদুর রহমান খান বলেন, "আমি এমন ঘটনাও দেখেছি যে কর্মচারী চাকরি থেকে অবসরে গিয়েছেন, অথচ তাঁর প্রাপ্য অবসরকালীন সুবিধা (রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট) বিমা কোম্পানি মিটিয়ে দেয়নি। সম্প্রতি আমার কাছে একটি তদবিরও এসেছে—একজন ব্যক্তি তাঁর বড় ভাইয়ের অবসরকালীন সুবিধার টাকা বিমা কোম্পানি থেকে আদায়ের জন্য অনুরোধ করেছেন। যদি এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তাকে চরম অব্যবস্থাপনা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।"
দ্রুত শৃঙ্খলা ফেরানোর তাগিদ
এনবিআর চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানান, তদবির বা সাময়িক তালি দিয়ে এই খাতের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে হলে বিমা খাতের বিদ্যমান অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
প্রাক-বাজেট আলোচনার শেষভাগে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিমা খাতকে অর্থনীতির শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত করতে হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিমা দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং দক্ষ ও পেশাদার জনবল তৈরির কোনো বিকল্প নেই। আইন অনুযায়ী গ্রাহকদের পাওনা যথাসময়ে বুঝিয়ে দিতে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



