ছবি: সংগৃহীত
দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঁধে সবসময়ই বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বোঝা থাকে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এর কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। তবে বছর শেষে হিসাবের খাতা মেলাতে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। অটোমেশন প্রক্রিয়া জোরদার ও করজাল সম্প্রসারণের মতো নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি সংস্থাটি। সদ্য সমাপ্ত এই অর্থবছরে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস—এই তিন প্রধান খাত মিলিয়ে এনবিআর মোট রাজস্ব আদায় করেছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। বছর শেষে রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রয়ে গেছে এক বিশাল শূন্যতা।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে মূল বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে বিশাল সরকারি ব্যয়ের কথা মাথায় রেখে সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রার পরিধি আরও কিছুটা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করে সরকার। সংশোধিত এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এনবিআরের চূড়ান্ত আদায় ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায় থেমে যাওয়ায় মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) এনবিআর কর্তৃক প্রকাশিত রাজস্ব আদায়ের সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে এই হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে।
এর আগে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ আরও কিছুটা বেশি হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। গত ১২ জুলাই জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রাথমিক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে জানিয়েছিলেন যে, বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা হতে পারে। তবে অর্থবছর শেষ হওয়ার পর দেশের সব কটি কাস্টমস হাউস ও কর অঞ্চল থেকে চূড়ান্ত হিসাব নিকাশ সম্পন্ন হলে এই ঘাটতির পরিমাণ প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় কিছুটা কমে আসে। চূড়ান্ত পরিসংখ্যানে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা হ্রাস পেয়ে সাড়ে ৮৭ হাজার কোটি টাকায় স্থির হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রার বিশাল পাহাড় টপকাতে না পারলেও আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি একেবারে ফেলার মতো নয়। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের সর্বমোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। সেই হিসাবে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে সার্বিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ।
খাতভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি আশাব্যঞ্জক ফলাফল এসেছে আয়কর খাত থেকে। এই খাতটি সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর খাত থেকে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। যেখানে এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাত থেকে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে আয়কর খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয় মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। দৈনন্দিন কেনাকাটা থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্প উৎপাদন—সব জায়গাতেই ভ্যাটের উপস্থিতি। এই ভ্যাট খাত থেকে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে সবচেয়ে বড় এই রাজস্ব উৎসে বছর ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
রাজস্ব আহরণের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক বা কাস্টমস খাত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল এই খাত থেকে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) কাস্টমস খাত থেকে ১ লাখ ৯৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে কাস্টমস খাতে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ।
অতীতের বিপুল ঘাটতি আর চ্যালেঞ্জের মাঝেই শুরু হয়েছে নতুন অর্থবছর। আর নতুন এই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে আরও একটি কঠিন ও পর্বতসম লক্ষ্যমাত্রা। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটিকে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদায়ী বছরের ঘাটতি এবং আদায়ের গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিলে নতুন এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এনবিআরের জন্য রীতিমতো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনের জন্য এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। এত বিশাল লাফ দেওয়া বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত দুঃসাধ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



