ছবি: সংগৃহীত
সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে দেশের সার্বিক পণ্য রপ্তানিতে অর্জিত হয়েছে ৪৭২ কোটি মার্কিন ডলার। যদিও এটি বিগত এক বছরের (১২ মাস) মধ্যে একক কোনো মাসে অর্জিত সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়, তবুও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সূচক দেখাচ্ছে নিম্নমুখী প্রবণতা। মূলত আমাদের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণেই এই গতি শ্লথ হয়েছে। তবে বরাবরের মতো তৈরি পোশাক খাতের ওপর একক নির্ভরতা না রেখে সার্বিক রপ্তানি বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে আশার আলো দেখিয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোমটেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত খাত। এসব সম্ভাবনাময় বিকল্প খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়েছে। রপ্তানি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং দেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বিগত ১২ মাসের হিসাব ও প্রবৃদ্ধির চিত্র
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সোমবার প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা ১২ মাসের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসেই সবচেয়ে বেশি ৪৭২ কোটি ডলারের পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠাতে পেরেছে বাংলাদেশ। এই সময়সীমার মধ্যে আয় অর্জনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চলতি ২০২৬ বছরের জানুয়ারি মাস (৪৪১ কোটি ডলার) এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে মে মাস (৪৪০ কোটি ডলার)।
এর বিপরীতে বছরের সবচেয়ে কম রপ্তানি আয় এসেছে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে—যথাক্রমে ৩৫০ কোটি ডলার ও ৩৪৮ কোটি ডলার।
তবে একক মাসের নিরিখে রেকর্ড গড়েও প্রবৃদ্ধির দিক থেকে জুলাই মাসটি গত বছরের রেকর্ড স্পর্শ করতে পারেনি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে রপ্তানি থেকে যেখানে আয় এসেছিল ৪৭৭ কোটি ডলার, সেখানে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭২ কোটি ডলারে। এর ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পণ্য রপ্তানি আয় সার্বিকভাবে কমেছে প্রায় ০.৯ শতাংশ। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক মূল স্ফীতি, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চাহিদা হ্রাস পাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবেই সামগ্রিক রপ্তানিতে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
শীর্ষ পাঁচ খাতের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুলাই মাসে অর্জিত মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই এসেছে দেশের শীর্ষ পাঁচটি খাত থেকে। খাতগুলো হলো:
-
তৈরি পোশাক (RMG)
-
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য
-
পাট ও পাটজাত পণ্য
-
কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য
-
হোমটেক্সটাইল পণ্য
নিচে শীর্ষ খাতগুলোর তুলনামূলক চিত্রে দেখা যাচ্ছে পোশাক ও কৃষি খাতে ধস নামলেও বাকি তিন খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে:
| রপ্তানি খাত | জুলাই ২০২৫-এর আয় | জুলাই ২০২৬-এর আয় | গতিধারা/প্রবৃদ্ধি |
| তৈরি পোশাক | ৩৯৬ কোটি ডলার | ৩৮৮ কোটি ডলার | নিম্নমুখী |
| কৃষি প্রক্রিয়াজাত | ~৯ কোটি ডলার | ৮ কোটি ২৩ লাখ ডলার | নিম্নমুখী |
| চামড়া ও চামড়াজাত | ১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার | ১৩ কোটি ডলারের বেশি | positive (+২.৮১%) |
| হোমটেক্সটাইল | — | ৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার | positive (+১৪.৩৭%) |
| পাট ও পাটজাত | ৫ কোটি ৫৪ লাখ ডলার | প্রবৃদ্ধির দিক থেকে শীর্ষ | positive (সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি) |
পোশাক ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতে পতন
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের মূল মূলভিত্তি বরাবরের মতোই তৈরি পোশাক খাত। তবে এই খাতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার কারণেই মূলত জাতীয় রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যেখানে পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছিল ৩৯৬ কোটি ডলার, সেখানে সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে তা কমে ৩৮৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং বিদেশি ক্রেতাদের বাড়তি কড়াকড়ির প্রভাব পড়েছে এই চালানে।
অন্যদিকে হতাশাজনক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি খাতটি। গত ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এ খাত থেকে প্রায় ৯ কোটি ডলার আয় হলেও এবার তা এক ধাক্কায় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮ কোটি ২৩ লাখ ডলারে। অভ্যন্তরীণ কাঁচামালের সংকট ও বিশ্ববাজারে কড়া মানের সনদের বাধ্যবাধকতা কৃষি খাতে আয়ের পথে বাধার সৃষ্টি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আশার আলো দেখাচ্ছে বিকল্প খাতসমূহ
প্রধান খাতে কিছুটা স্থবিরতা থাকলেও অপ্রচলিত ও ঐতিহ্যবাহী খাতগুলো বেশ নজরকাড়া পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে; গত বছরের ১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার রপ্তানির বিপরীতে এবার এই খাতের আয় ১৩ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ২.৮১ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
আরও বেশি চমক দেখিয়েছে হোমটেক্সটাইল খাত। সদ্য সমাপ্ত জুলাইয়ে এ খাতটি ১৪.৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে দেশে ৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে এসেছে।
তবে প্রবৃদ্ধির হারের দিক থেকে সবচেয়ে বড় চমক ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য খাতে। গত বছরের জুলাইয়ে এ খাতের রপ্তানি আয় যেখানে ছিল ৫ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, এবার শতাংশের হিসাবে শীর্ষ পাঁচ খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ অর্জনের প্রবৃদ্ধি নথিভুক্ত করেছে এই ঐতিহ্যবাহী পাট খাত।
বিশেষজ্ঞদের মত ও করণীয়
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের স্পষ্ট মতামত, তৈরি পোশাক এককভাবে মোট রপ্তানির বড় অংশ দখল করে রাখায় সেই খাতে সামান্য ধস নামলেই পুরো দেশের সার্বিক রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে পড়ে। জুলাই মাসের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেবল একক খাতের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। চামড়া, পাট ও হোমটেক্সটাইলের মতো খাতগুলোতে যদি সঠিক নীতিগত সহায়তা, কর ছাড় এবং অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধি করা যায়, তবে এসব বিকল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে। বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা সামাল দিতে অনতিবিলম্বে রপ্তানি পণ্য বহুমুখী করা এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



