ছবি: সংগৃহীত
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অথচ গৌরবময় অধ্যায় হয়ে আছে গত বছরের জুলাই মাসে সংঘটিত জন-অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থান শুধু একটি শাসকের পতন নয়, বরং ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয়, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তবে আন্দোলনের এক বছর পার হলেও, এখনো পর্যন্ত সেই গণজাগরণে শহীদ হওয়া বীরদের নিয়ে সরকারের উদ্যোগ সীমিতই রয়ে গেছে।
একদিকে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়ে ইতিহাস বদলে দেওয়া শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি, অন্যদিকে এই বীরদের কবর সংরক্ষণ, পরিচয় নিশ্চিতকরণ কিংবা তালিকা প্রস্তুতকরণের মতো মৌলিক কাজেও দেখা যাচ্ছে চরম উদাসীনতা। ফলে তাদের আত্মত্যাগ ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২০২৩ সালের জুলাই-আগস্টে দেশে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানে সরকারি তথ্য অনুযায়ী নিহত হয়েছিলেন ৮৪৪ জন, কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (ওএইচসিএইচআর) প্রকাশিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট অনুযায়ী এ সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ জন। শুধু তাই নয়, শহীদের তালিকা তৈরি নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য উঠে এসেছে সরকারের গেজেট ও ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এর মধ্যে।
সরকারি গেজেটে যে ৮৪৪ জনের নাম রয়েছে, ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে সেই সংখ্যা ৮২০। আবার জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নিহতদের মধ্যে ১১৮ জন শিশু বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোট শহীদের ১২-১৩ শতাংশ।
এই বিভ্রান্তির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে—অভ্যুত্থানের পরপরই শহীদদের একটি নির্ভুল তালিকা তৈরির জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ঘোষণা দিলেও এক বছর পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তব রূপ পায়নি।
রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে আন্দোলনের শেষ সময়ে গণকবরে দাফন করা হয় ১১৪ জন শহীদকে। এদের অধিকাংশের পরিচয় এখনো অজানা। যদিও সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল—ডিএনএ টেস্ট করে লাশ শনাক্ত করা হবে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত এই কাজ বাস্তবে শুরু হয়নি।
সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গত ফেব্রুয়ারিতে এক অনুষ্ঠানে এসব লাশ শনাক্ত করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা অগ্রসর হয়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে আরও ৬টি বেওয়ারিশ লাশ। এর মধ্যে ৫ জন পুরুষ ও ১ জন নারী। চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি মর্গ কর্তৃপক্ষ এই তথ্য জানায়। লাশগুলোর ময়নাতদন্তে বলা হয়েছে, পাঁচজনের মৃত্যুর কারণ আঘাতজনিত এবং একজনের ওপর থেকে নিচে পড়ে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু গত ৭ মাসেও এদের পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তরের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
নাঈম নামের এক শহীদের বাবা কামরুল ইসলাম বলেন, “আমার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। কিন্তু সেভাবে কোনো সম্মান পাইনি। কাগজে-কলমে অনেক কথা বলা হলেও বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই। সহায়তা পেতে গিয়ে যে পরিমাণ হয়রানি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
তিনি আরও বলেন, “ছেলের কবরটাও ভালোভাবে বাঁধাই করা হয়নি। অনুষ্ঠান হলেই আমাদের ডাকা হয়, বক্তব্য নেওয়া হয়। অনুষ্ঠান শেষ হলেই কেউ আর খোঁজ নেয় না।”
এই কথাগুলো শুধু নাঈমের বাবার একার নয়, আন্দোলনে প্রাণ হারানো অধিকাংশ শহীদ পরিবারেরই প্রতিধ্বনি।
আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলো শহীদদের সম্মান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবে তা রূপ নেয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেন, “এগুলো মূলত মিডিয়া কাভারেজ পাওয়ার কৌশল, ভোটের রাজনীতির অংশ।”
অনেক শহীদের স্ত্রী অভিযোগ করেন, সহায়তা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি অনেক থাকলেও, বাস্তবে কোনো টাকা বা ভাতার ব্যবস্থা পেতে গেলে ঘুরতে হয় দফতরে দফতরে। কেউ কেউ নিজের সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে অন্যের বাসায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরকারি গেজেট অনুসারে যেসব শহীদকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের পরিবারকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা, মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা এবং ১ হাজার ৩৫৫ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তবে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা অগ্রগতির তথ্য নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা তৈরির ইতিহাসের সঙ্গেও মিলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পরও বারবার শহীদদের তালিকা তৈরির দাবি উঠলেও তৎকালীন সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ফলে আজও সেই শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি, প্রশ্ন ও দ্বিধা।
জুলাই অভ্যুত্থানেও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে—শহীদদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি, তালিকা অসম্পূর্ণ, লাশ শনাক্ত হয়নি, পরিবারগুলো বঞ্চিত—সব মিলিয়ে যেন শহীদের রক্তের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতকতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকেরা বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত বিজয়। ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার ১৬ বছরের দুঃশাসন, ভারতের সরাসরি মদদে চালিত একচ্ছত্র শাসনের অবসান হয় এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কোটা সংস্কার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই রূপ নেয় স্বৈরশাসনবিরোধী এক গণজাগরণে। এবং ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দমন-পীড়নের মাধ্যমে তা দমন করতে চায় হাসিনার সরকার।”
জাতিসংঘের তথ্যমতে, আন্দোলনের সময় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ১ হাজার ৪০০ নিরস্ত্র মানুষকে। আহত হন অন্তত ১৫ হাজার।
এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যখন দেশ ফিরে পায় একটি অন্তর্বর্তী গণতান্ত্রিক সরকার, তখন শহীদদের মর্যাদা রক্ষাই ছিল সবার অগ্রাধিকার। কিন্তু এক বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেই শহীদদের অনেকেই এখনো অচেনা, অজানা, বেওয়ারিশ—এবং হয়তো একদিন ইতিহাসের পাতায় নামহীন হয়ে হারিয়ে যাবেন, যদি না এখনই নেওয়া হয় কার্যকর ও সম্মানজনক উদ্যোগ।
শহীদদের রক্ত যেন শুধু স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রকে হতে হবে আরও দায়বদ্ধ, আরও মানবিক। না হলে ভবিষ্যতের কোনো আন্দোলনেই শহীদেরা আর রাষ্ট্রের ওপর ভরসা রাখতে পারবে না।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



