ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সার্বিক প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অনেক আলাপ-আলোচনার পর স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে শুরু হচ্ছে ভোট।
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ২৭ মে পর্যন্ত ধাপে ধাপে চলবে ইউপি ভোট। মোট ৪ হাজার ২৭২টি নির্বাচন উপযোগী ইউপিতে সাত ধাপে ভোট গ্রহণ হবে। এরপর শুরু হতে পারে পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। তবে ইউপি নির্বাচন শুরুর আগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক, আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা নিরাপত্তা রক্ষায় সমন্বিত বৈঠক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে ইসি।
পরিকল্পনায় থাকা ইউপি নির্বাচন নিয়ে গত রোববার ও সোমবার পর দুদিন ধরে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক বৈঠক করেছে ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বে এসব বৈঠকে চার নির্বাচন কমিশনার এবং ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যোগ দেন। এসব বৈঠকেই মূলত ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ও প্রাথমিক পরিকল্পনার খসড়া করা হয়েছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ইসির আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।
দুদিনের বৈঠক শেষে সোমবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের ইউপি নির্বাচন নিয়ে ইসির এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, প্রথম ধাপে প্রায় ৮০টি উপজেলার সব ইউপিতে ১২ নভেম্বর ভোটগ্রহণ হবে। দ্বিতীয় ধাপের ভোট ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ও শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘ভোট নিয়ে প্রাথমিকভাবে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এটা চূড়ান্ত নয়। এটাকে সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত হিসাবে নিতে পারেন। ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আছে। সেখানে এটি চূড়ান্ত করা হবে।’
কোন ধাপের ভোট কীভাবে
দেশে মোট চার হাজার ৫৮০টি ইউপি রয়েছে। ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী- ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ২৭২টি ইউনিয়ন নির্বাচনের সময়সীমার মধ্যে পড়বে। ইউনিয়ন পরিষদ আইনে পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচন উপযোগী এই ৪ হাজার ২৭২টি ইউপিতে ভোটের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম পাঁচ ধাপে ৬৩টি জেলার ৮০টি উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণ করা হবে। আগে ইসির চেষ্টা ছিল প্রথম ধাপেই দেশের ৬৪টি জেলায় ভোট আয়োজনের। তবে আগামী ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন থাকায় প্রথম ধাপে এই জেলার কোনো উপজেলায় ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নেই ইসির।
ইসি বলছে, প্রথম ধাপে যত বেশি সংখ্যক উপজেলার ইউপি নির্বাচন শেষ করার চেষ্টা থাকবে। ষষ্ঠ ও সপ্তম ধাপ রাখা হবে মূলত বাকি থাকা ইউপিগুলোর জন্য। প্রথম দিকের ধাপগুলোতে কোনো কারণে নির্বাচন করা সম্ভব না হলে সেসব ইউপি শেষের দুই ধাপে নেওয়া হবে। প্রথম ধাপে কোন কোন ইউপিতে ভোট হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে কমিশনের প্রাথমিক নির্দেশনা অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও বাদে বাকি ৬৩টি জেলার অন্তত একটি উপজেলার সব ইউপিতে ভোট হবে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলার একাধিক উপজেলায় ভোট নেওয়া হবে। কয়েকটি বাদে বাকিগুলোর সদর উপজেলায় প্রথম ধাপে নির্বাচন হবে। সবশেষ ইউপি ভোট হয়েছে ২০২১ সালের এপ্রিল, নভেম্বর ও ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে। সেবারও সাত ধাপে ভোট হয়েছিল। এই কারণে ইসি এবারও সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের ভোট শেষ করার চিন্তাভাবনা করছে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘বাস্তবতার কারণে কিছু ইউপি নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে গেছে। নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণে বিভিন্ন বার্ষিক পরীক্ষা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা, দুর্গাপূজা, রমজান ও ঈদসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব ইউপির নির্বাচন করার সময় হয়ে গেছে, সেগুলোকে প্রথম দিকের ধাপে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ৬৪টি জেলাতেই একসঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার চেষ্টা থাকবে। তবে প্রথম ধাপে ঠাকুরগাঁও জেলা বাদ থাকবে। সেখানে একটি উপনির্বাচন থাকায় ঠাকুরগাঁওয়ের ইউপিগুলো দ্বিতীয় ধাপে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জেলা সদরের উপজেলার ইউপিগুলোকে প্রথম ধাপে রাখার চেষ্টা করা হবে। যেসব জেলায় সদর উপজেলা নেই, সেসব জেলার সদর উপজেলার কাছাকাছি এলাকার ইউপিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জেলার ভেতরের সম্পদ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে জানিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘একই জেলার মধ্যে থাকা ভোটগ্রহণের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীদের কাজে লাগিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।’
বিদ্যমান আইনেই নির্বাচন
বিদ্যমান স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও ইউপি) আইন সংশোধনের সুপারিশ সরকারকে দিয়েছে ইসি। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের অংশগ্রহণে নিষেধ, দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বাতিল এবং স্থানীয় সরকারের দায়িত্বরত প্রশাসকদের ভোটে লড়াকে অযোগ্য করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে ইসি। সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, এরপর সংসদে সংশোধনী বিল এনে পাস হতে হবে। জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে ১০ সেপ্টেম্বর। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে সংসদ বসতে হবে। সে হিসেবে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে অধিবেশন বসার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ১২ নভেম্বর ভোট নিতে হলে কমপক্ষে ৪৫ দিন আগে তপশিল ঘোষণা করতে হবে। এ কারণে ইউপি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগেই বিদ্যমান আইন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বললে চলে।
ইউপি নির্বাচন কোন আইনের অধীনে হবে- এ বিষয়ে কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘বিদ্যমান আইনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আইনের বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিস্তারিতভাবে ব্রিফ করবেন। তবে প্রাথমিকভাবে বলা যায়, বর্তমানে যে আইন রয়েছে, সেই আইনের অধীনেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
দফায় দফায় বৈঠক করবে ইসি
ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে চলতি মাসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করবে ইসি। এর মধ্যে নির্বাচনের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক হবে। আগে বৈঠকটি ১৭ সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা থাকলেও আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের কারণে তা চার দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকটি হবে। মূলত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক থেকেই ইউপি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে
ইউপি নির্বাচন নিয়ে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর তিন ধাপে এই আলোচনা হতে পারে। দলগুলোর নিবন্ধনের ক্রম অনুযায়ী তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। প্রতিটি দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন। এর আগে অবশ্য ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, এবার থেকে স্থানীয় নির্বাচনগুলো নির্দলীয় হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে ইসি। তবে এরই মধ্যে ইসির স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইন-কানুন ও বিধি-বিধান নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছুটা মতভেদ দেখা দেওয়ায় ইসি এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাদের সহযোগিতা চাওয়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেভাবে সুশৃঙ্খলভাবে এবং কোনো ধরনের গণ্ডগোল ছাড়াই সম্পন্ন করা হয়েছে, একইভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু ও শেষ করতে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা চায়।’
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



