ছবি: সংগৃহীত
ঢাকায় চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ব্যয় প্রাক্কলনের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার বিকল্প পথ খুঁজছে। বিশেষ করে এমআরটি লাইন-১ (কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর ও কুড়িল থেকে পূর্বাচল) এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুট (সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত) নির্মাণে ব্যয়ের প্রস্তাব এতটাই বেশি এসেছে যে সরকার এখন জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা (JICA) বাদ দিয়ে অন্য কোনো দেশের প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ করার চিন্তাভাবনা করছে।
জাইকার সহযোগিতায় সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রস্তুতের পর ২০১৯ সালে সরকার এই দুই প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন করেছিল প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ এর জন্য ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ এর জন্য ৪১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রস্তাব অনুযায়ী দুটি প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা, যা সরকারের প্রাথমিক হিসাবের দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয়ই প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রস্তাব এসেছে। এ ক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একইভাবে এমআরটি লাইন-৫ এর ব্যয়ও এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গত ২৪ আগস্ট থেকে দুই সপ্তাহের জন্য জাপান সফরে যায়। সেখানে জাইকার প্রেসিডেন্টসহ সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। আলোচনায় প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং পুনঃপর্যালোচনার দাবি জানানো হয়। জাপান সরকারের সঙ্গেও প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়, যেখানে ব্যয় কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
প্রতিনিধি দল দেশে ফেরার পর সরকার নতুন করে ব্যয় যাচাই ও পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এতে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। কমিটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, অন্যান্য দেশের মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়, স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি ও প্রযুক্তিগত বিষয় বিশ্লেষণ করে একটি যৌক্তিক ব্যয়ের প্রস্তাব তৈরি করবে। এরপর এই প্রস্তাব জাইকার কাছে পেশ করা হবে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, “সরকারের ঋণ বেড়ে যাচ্ছে, তাই নতুন করে অতিরিক্ত ঋণের বোঝা নেওয়া সম্ভব নয়। প্রাথমিকভাবে যেসব ব্যয় ধরা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যয় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়তে পারে, কিন্তু এর চেয়েও অনেক বেশি দেখানো হচ্ছে। এজন্য ব্যয় কমানোর দাবি জানানো হয়েছে। যদি জাইকা রাজি না হয়, তাহলে অন্য কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।”
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত লাইন-৬ এর ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সেই লাইন থেকে পাওয়া আয়ে জাইকার ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নতুন দুটি লাইনের বিপুল ব্যয় ভবিষ্যতে দেশের মানুষের ওপর বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় কয়েকগুণ বেশি। আওয়ামী লীগ আমলে দর কষাকষির নামে সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন বলে তাদের অভিযোগ।
ঢাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ইতোমধ্যে লাইন-৬ (উত্তরা থেকে কমলাপুর) এর কাজ প্রায় শেষ। চলমান দুটি বড় প্রকল্প এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ এর ব্যয় নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি বিতর্ক। লাইন-১ এ পাতাল ও উড়ালপথ মিলিয়ে মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১ কিলোমিটার, আর লাইন-৫ (নর্দান রুট) হবে ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী ও নতুনবাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত অংশ উড়ালপথে, বাকিটা পাতালপথে নির্মাণ হবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “এত উচ্চমূল্যে মেট্রোরেল নির্মাণ সম্ভব নয়। জাইকাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি ঋণে অতিরিক্ত ব্যয়ের এই প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করতে পারে। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, নতুন ঋণ না নিয়ে ব্যয় যৌক্তিক করা এবং সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন হলো—জাইকা কি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমাতে রাজি হবে, নাকি বাংলাদেশ বিকল্প উৎস খুঁজে নতুন পথে হাঁটবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



