ছবি: সংগৃহীত
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের তিন মাসের বেশি সময় (৯৭ দিন) পার হলেও ভাইরাসবাহিত এ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামাছেই না। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হাম সন্দেহে ১ হাজার ৭৮ এবং নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেছে ৯৬ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হাম সন্দেহ ও নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৮৫১ জন। একইভাবে হাম সন্দেহে ও নিশ্চিত হাম আক্রান্তে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭০ জন। মৃতদের প্রায় সবাই শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
দেশে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে হামের রোগী শনাক্ত বেশি হতে থাকে। তবে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় মার্চ মাস থেকে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর অবস্থা বেগতিক হওয়ায় পরিস্থিতিকে আউটব্রেক (প্রাদুর্ভাব) ঘোষণা করা হয়। সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয় ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের অভাবে এ রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তিন মাসের বেশি সময় ধরে হামের প্রাদুর্ভাব চললেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দায়ী বলে মন্তব্য করছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তার মতে, জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে সঠিক মাইক্রোপ্ল্যানিং না হওয়ায় অনেক শিশু এখনো টিকার আওতার বাইরে রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু টিকা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, চিকিৎসার আওতায় আনা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং আইসোলেশন-স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব ব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় এখনো প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
সরকার গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া শুরু করে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনে টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এই কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য ছিল ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেবে। ২০ মে টিকা কার্যক্রম শেষ হয়; কিন্তু এ পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭২ হাজার ২৪ শিশুকে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে ৪ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৭৮ জন সন্দেহভাজন হামরোগী পাওয়া গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত সন্দেহভাজন হামরোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ৯৮২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ৯৬ জন, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৮৬৯ জন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, একজন হাম আক্রান্ত রোগী অন্তত ১২ থেকে ১৮ শিশুকে সংক্রামিত করতে পারে। কিন্তু এবার শুরু থেকেই হামের সংক্রমণ রোধে এসব তৎপরতার অভাব ছিল। ভাইরাসটি কোথা থেকে ছড়াচ্ছে। প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় টিকাদানের বাইরে আরও কী কী উদ্যোগ দরকার, সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ সে বিষয়ে তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



