ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বড় পরিসরের বিনিয়োগ অংশীদারত্বে রূপান্তর করতে ৫টি অগ্রাধিকার খাত নির্দিষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার বিকেলে জাপানের রাজধানী টোকিওর জেটরো হলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে মূল বক্তৃতার সময় তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রতি এই আহ্বান জানান। পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই সফরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে রেকর্ড সংখ্যক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী ৫টি কৌশলগত ক্ষেত্রকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। খাতগুলো হলো—মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, রেলপথ ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প।
-
মোটরযান উৎপাদন: দেশের তরুণ শ্রমশক্তি ও বৃহৎ বাজারের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি মাসের শুরুর দিকে টয়োটা বাংলাদেশে যানবাহন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নিয়ে চলা এই কার্যক্রমে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
-
জ্বালানি খাত: তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। এক্ষেত্রে জাপানের জেরার (JERA) সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান সহযোগিতার প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়।
-
প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ‘বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানি অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
-
রেলপথ ও সরবরাহ ব্যবস্থা: ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে সংযুক্ত করতে উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাস্টারপ্ল্যান এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় জাপানি কারিগরি ও বিনিয়োগ সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
-
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ: বহুমুখী কৃষি উৎপাদনকে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আড়াইহাজারে জাপানি মানদণ্ডে গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিংয়ের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে কৃত্রিম তন্তু, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেটরো) প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমুর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে উৎপাদনশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অর্থনৈতিক ফোরামে উপস্থাপित তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নিচে। সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি ডলার এবং জাপান থেকে আমদানি ছিল ২১৬ কোটি ডলার।
এই ব্যবধান ঘোচাতে এবং আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারত্বের ভিত্তি গড়তে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (EPA) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৯৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে এবং বিপরীতে জাপানি পণ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা লাভ করবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিয়োসেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
টোকিওর ‘হোটেল নিউ ওতানি’-তে বাংলাদেশ কমিউনিটির আয়োজনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। জাপানের সুশৃঙ্খল নাগরিক জীবন, পরিচ্ছন্নতা এবং আইনের শাসন থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশকে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শহরে রূপান্তর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি জাপানি ভাষা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণের নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বর্তমান সংস্কার কার্যক্রম প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রান্তিক মানুষ যেন প্রকৃত সুফল পায়, সেই লক্ষ্যেই সংস্কার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় দেশ ও দশের কল্যাণে প্রবাসীসহ সব গণতান্ত্রিক মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ সফররত মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।প্রধানমন্ত্রীর এই জাপান সফরে দুই দেশের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ১টি চুক্তি, ৪টি সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং ২টি অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে দুই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং বিশ্ববাজারে এক নতুন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



