ছবি: সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জে ভ্যাট ফাঁকির এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, নারায়ণগঞ্জের নিবারক দলের একটি বিশেষ আভিযানিক দল শহরের ঐতিহ্যবাহী তানবাজার এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে ছয় শ কোটি টাকার বিক্রয় তথ্য গোপন এবং ৪০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে। এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, নারায়ণগঞ্জ-এর নিবারক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ও নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে ৫৬, এস. এম. মলেহ রোড, তানবাজার, নারায়ণগঞ্জ সদর এলাকার আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিং’ (বিআইএন: 001292681-1401)-এ আকস্মিক পরিদর্শনে যায়।
অভিযানকালে নিবারক দলের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের গুদাম, দোকান এবং সামগ্রিক হিসাব ব্যবস্থাপনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের আইনানুগ মূসক (ভ্যাট) সংক্রান্ত দলিলাদি বা কাগজপত্র ভ্যাট কর্মকর্তাদের দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন।
প্রাথমিক পর্যায়ে দলিলাদি প্রদর্শনে ব্যর্থ হওয়ার পর নিবারক দল প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন রেকর্ডপত্র তল্লাশি করে। এ সময় দোকান থেকে কিছু সংখ্যক রেজিস্টার, খাতা, চালান বই, গার্ড ফাইল এবং প্রতিষ্ঠানটির কম্পিউটার থেকে উদ্ধার করা ডিজিটাল এক্সেল শিটের কপি জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে জব্দকৃত তথ্যাদি ও দলিলাদি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধির স্বাক্ষর নিয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।
দপ্তরে এনে জব্দকৃত নথিপত্র এবং হিসাবের খাতাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন ভ্যাট কর্মকর্তারা। প্রাথমিক পর্যালোচনায় বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর বিধান লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটি পণ্য বিক্রির সময় ক্রেতাদের নিকট বাধ্যতামূলক কোনো মূসক চালান বা চালানপত্র ইস্যু করত না।
তবে জব্দকৃত দলিলাদি ও কম্পিউটারের এক্সেল শিট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৬৫৯,১৪,৬০,৫৯১/- (ছয়শত উনষাট কোটি চৌদ্দ লক্ষ ষাট হাজার পাঁচশত একনব্বই) টাকা মূল্যের সুতা বিক্রি করেছে। এই বিপুল পরিমাণ বিক্রয়ের বিপরীতে ৫% ও ৭.৫% হারে সরকারের মোট প্রদেয় মূসকের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০৪,০৪৪,৪৪২/- (চল্লিশ কোটি চল্লিশ লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার চারশত বিয়াল্লিশ) টাকা।
ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিনব কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি জানুয়ারি ২০২২ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের বিভিন্ন মাসের নির্ধারিত দাখিলপত্রে (মূসক-৯.১) প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন করে। এই সময়ে তারা মাত্র ৩৯১,৬৫৩,২৩০/- টাকা বিক্রয় দেখিয়ে দায় সারার চেষ্টা করে।
শুধু তাই নয়, একই দীর্ঘ সময়ে সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে মাত্র ১,৩৩,৫০০/- (এক লক্ষ তেত্রিশ হাজার পাঁচশত) টাকা ভ্যাট বা রাজস্ব জমা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ, গত ৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটির নিকট সরকারের প্রকৃত বকেয়া মূসকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে:
-
মোট প্রদেয় মূসক: ৪০৪,০৪৪,৪৪২ টাকা
-
বাদ: পরিশোধিত রাজস্ব: ১,৩৩,৫০ টাকা
-
অবশিষ্ট বকেয়া রাজস্ব (আদায়যোগ্য): ৪০,৩৯,১০,৯৪২/- (চল্লিশ কোটি উনচল্লিশ লক্ষ দশ হাজার নয়শত বিয়াল্লিশ) টাকা।
ভ্যাট সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিং’ কর্তৃক সংঘটিত এই অপরাধ মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা-১৫, ৩২, ৪৫, ৪৯ ও ৬৪ এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬ এর বিধি ২৫, ৪০, ৪২ ও ৪৭ এর সুস্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন।
প্রতিষ্ঠানটির এই ধরণের অবৈধ ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ৮৫ এর (ছ), (ঞ), (ট) ও (ড) অনুযায়ী সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে সরকারের পরিহারকৃত মূসক, প্রযোজ্য জরিমানা এবং একই আইনের ধারা-১২৭ অনুযায়ী বকেয়া রাজস্বের ওপর প্রযোজ্য সুদসহ সম্পূর্ণ অর্থ আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মূসক ফাঁকির মামলা দায়ের করা হয়েছে।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, নারায়ণগঞ্জের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় এবং এ ধরনের অনিয়ম ও ভ্যাট ফাঁকি রোধে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কঠোর অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



