ছবি: সংগৃহীত
শুধু একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনই নয়, বরং দেশের প্রতিটি ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে একই উচ্চমানের মানদণ্ডে উন্নীত করার একটি টেকসই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং কমিশনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে সিইসির বক্তব্যের চুম্বক অংশগুলো তুলে ধরা হলো:
১. নির্বাচনের টেকসই সংস্কৃতি ও মানদণ্ড রক্ষা
সিইসি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ন্যূনতম মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, তা শুধু ধরে রাখাই নয়, বরং ভবিষ্যতের সব নির্বাচনে তা আরও উন্নত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে কমিশন। তিনি বলেন, “নির্বাচনব্যবস্থা কোনো এককালীন আয়োজন নয়। একটি ভালো নির্বাচন করেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং দেশে একটি ভালো নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।” আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনেও জাতীয় সংসদের মতো বা তার চেয়েও ভালো মান বজায় রাখতে কমিশন বদ্ধপরিকর।
২. চাপমুক্ত পরিবেশে স্বাধীন কার্যক্রম
কমিশনের নিরপেক্ষতার কথা উল্লেখ করে সিইসি স্পষ্ট জানান, ইসির কাজে কোনো পক্ষের কোনো চাপ নেই। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই গণভোট আয়োজন, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা চালু এবং প্রবাসী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কারাবন্দীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে কমিশন। এছাড়া আসন্ন ইউপি নির্বাচন পরিচালনার জন্য ভোটকেন্দ্র, ভোটার তালিকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
৩. রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও প্রার্থীদের পেছনে রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকতে পারে—এটি মাথায় রেখে চলতি নভেম্বর মাসেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। সিইসি মনে করেন, সুষ্ঠু গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতিবিদদের আন্তরিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
৪. সহিংসতা রোধে কঠোর নজরদারি ও সিসি ক্যামেরা
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা ও প্রাণহানির অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সিইসি। তিনি জানান:
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরেও ক্যামেরা সংযুক্ত থাকবে, যাতে অনিয়মের দৃশ্য সরাসরি রেকর্ড থাকে।
আইনগত মেয়াদোত্তীর্ণ ও আদালতের নির্দেশাধীন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউপিতে ধাপে ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
৫. মানুষের আস্থা ফেরানো ও ভোটার তালিকা হালনাগাদ
দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত বিভিন্ন নির্বাচন নিয়ে মানুষের হারানো আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনাকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল বর্তমান কমিশন। ভোটার তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে প্রায় ৭৭ হাজার কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করেছেন। এর ফলে প্রায় ১০ লাখ নতুন নারী ভোটার তালিকাভুক্ত হয়েছেন এবং ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
৬. সাংবাদিকদের অবাধ প্রবেশ ও স্বচ্ছতা
নির্বাচনী কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাংবাদিকদের জন্য ইসির দরজা সবসময় উন্মুক্ত বলে জানিয়েছেন সিইসি। জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের কার্ড ইসি থেকে এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রেস ক্লাবের সাথে আলোচনা করে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৭. স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সীমা ও নারী অংশগ্রহণ
দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করছে ইসি। ইউপির পর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর জোরালো ভূমিকা ও সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন সিইসি।
৮. তরুণ ভোটারদের বিশেষ সুযোগ
এবার ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারাও ভোটার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রথাগত ১ জানুয়ারি নিয়মের বাইরে গিয়ে নেওয়া এই পদক্ষেপে আরও বেশি সংখ্যক তরুণ ভোটার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন।
সবশেষে, একটি সুন্দর, গ্রহণযোগ্য ও মানসম্মত নির্বাচন উপহার দিতে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, গণমাধ্যমকর্মী এবং ভোটারসহ সকল অংশীজনের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



