ছবি: সংগৃহীত
অভ্যন্তরীণ বাজারের দুর্বল চাহিদা, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মারাত্মক মুনাফা ঘাটতি এবং অতিরিক্ত মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে চীনের শেয়ারবাজারে কোনোভাবেই স্বস্তি ফিরছে না। দিন দিন পতনের মাত্রা তীব্র হওয়ায় সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি চাঙ্গা করার বিভিন্ন পদক্ষেপ দেখা গেলেও চীনে নতুন করে বড় কোনো সরকারি প্রণোদনা আসার সম্ভাবনা কমে আসায় বাজার পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টাও মুখ থুবড়ে পড়েছে।
বিভিন্ন আর্থিক সূচক বিশ্লেষণ ও সংকলিত বাজারতথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এ পর্যন্ত চীনের শেয়ারবাজারের মোট মূল্য কমেছে প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশেষ করে শেষ কয়েক সপ্তাহের অবিরাম দরপতন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ধারাবাহিক এই ধসের কারণে চীনের শীর্ষস্থানীয় শেয়ারসূচক 'সিএসআই ৩০০' (CSI 300) আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দা বা 'বিয়ার মার্কেটে' প্রবেশ করেছে। একই সময়ে হংকংয়ের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোতেও বড় ধরনের বিক্রয়চাপ লক্ষ করা গেছে, যা সামগ্রিক এশীয় বাজারকে মন্দার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের শেয়ারবাজারের এই বিপর্যয়মূলক অবস্থার পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে দেশের দুর্বল ভোক্তা ব্যয় এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে চলমান অনিয়ন্ত্রিত মূল্যযুদ্ধ। বাজারে টিকে থাকতে কম দামে পণ্য ও সেবা বিক্রির এই চরম প্রতিযোগিতা ব্যাংক, বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) প্রস্তুতকারক ও শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল মুনাফায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জার্মানির বিখ্যাত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বেরেনবার্গের বহুমাত্রিক সম্পদ বিনিয়োগ কৌশল ও গবেষণা বিভাগের প্রধান উলরিখ উরবান মন্তব্য করেছেন, চীনের অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন সময় বা তলানি পার হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সময় এখনও আসেনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, উৎপাদন ও বৈশ্বিক রপ্তানি খাতে চীন শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, সেই সাফল্যকে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি ও করপোরেট মুনাফায় রূপান্তর করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন বহুজাতিক ও চীনা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সিএটিএল (CATL) তীব্র প্রতিযোগিতা ও ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের টেক জায়ান্ট চায়না মোবাইল চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মেয়াদে নিট মুনাফায় বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ ঘাটতি হিসাব করেছে। এছাড়া লিথিয়াম খাতের জায়ান্ট গানফেং লিথিয়ামও বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম পড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
কমেছে মুনাফার পূর্বাভাস ও প্রযুক্তি খাতের নতুন চাপ
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের শেষ ভাগ থেকে 'এমএসসিআই চায়না' সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর ২০২৬ সালের প্রাক্কলিত মুনাফার পূর্বাভাস ৪ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে হংকংয়ের 'হ্যাং সেং টেক' সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য মুনাফার প্রাক্কলন ১৩ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। হতাশাজনক বিষয় হলো, পূর্বাভাস কমানোর পরও সম্প্রতি যেসকল চীনা কোম্পানি তাদের আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করেছে, তাদের প্রকৃত আয় বিশ্লেষকদের সর্বনিম্ন প্রত্যাশার চেয়েও গড়ে ৯ শতাংশ কম হয়েছে। বিগত দুই বছরের মধ্যে করপোরেট আয়ের ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে বড় ঘাটতি। বোল্ড ওয়েলথ পার্টনার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জেসন লেমায়ারের মতে, সিএটিএলের মতো অত্যন্ত উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানও যখন বাজার প্রতিযোগিতা ও আয়ের চাপ সামলাতে পারছে না, তখন সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য এই বাজারের আকর্ষণ ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতের উচ্চ ব্যয়। চীনের বড় বড় প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ভিত্তিক কোম্পানিগুলো একদিকে যেমন রাজস্ব কমার সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে প্রতিযোগী বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন শেয়ার ইস্যু করে বাজার থেকে মূলধন তোলার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি আলিবাবা গ্রুপ হোল্ডিং কর্তৃক ১০ বিলিয়ন ডলারের নতুন শেয়ার বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে এবং বিদ্যমান শেয়ারের মূল্য আরও কমিয়ে দিয়েছে।
সুমিতোমো মিতসুই ডিএস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক স্ট্যানলি ট্যাং মনে করেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিচারে এই মুহূর্তে চীনের চেয়ে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের কোম্পানিগুলোর অবস্থান অনেক বেশি ইতিবাচক। চীনের প্রযুক্তি খাত নিজস্ব প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করলেও তা সরাসরি শেয়ারবাজারের মূল্যায়নে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
চীনের অভ্যন্তরীণ শেয়ারবাজারে লেনদেনের পরিমাণ গত বছরের জুলাইয়ের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। উপরন্তু, মার্জিন ঋণ বা ধার করা অর্থে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছানো প্রমাণ করে যে ক্ষুদ্র ও বড় বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চীনা কর্তৃপক্ষ 'জাতীয় দল' (National Team) নামে পরিচিত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিলকে বাজারে সক্রিয় করে শেয়ার ক্রয়ের নির্দেশ দিয়েছে। তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছেন, এই বড় পতনের ফলে কিছু শেয়ারের দর যৌক্তিক সীমার নিচে নেমে আসায় দীর্ঘমেয়াদে তা আকর্ষনীয় হতে পারে। যেমন বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসের চীনা শাখা জানিয়েছে, তারা বাজার নিয়ে 'সতর্কভাবে আশাবাদী'। তাদের মতে, তারল্যসংকটের কারণে সাময়িক এই ধস নামলেও সরকারি নীতি ও বন্ডের কম মুনাফার কারণে ভবিষ্যতে অর্থ আবার শেয়ারবাজারে ফিরে আসতে পারে।
যদিও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রথম নয় মাসের প্রবৃদ্ধিও সরকারের নির্ধারিত ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ভেতরেই রয়েছে, তবুও সেই প্রবৃদ্ধি দেশের করপোরেট খাতের মুনাফা বা শেয়ারবাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকার একবারে বড় ধরনের কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ না দিয়ে ধাপে ধাপে সহায়তার নীতি বজায় রাখবে। ফলে, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, ভীতি দূর করা এবং করপোরেট মুনাফায় স্থিতিশীলতা আনা না গেলে চীনের শেয়ারবাজারে টেকসই ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



